স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়া অঞ্চলে দুটি উচ্চগতির যাত্রীবাহী ট্রেনের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত এবং ৭৩ জনের বেশি যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। রোববার (১৮ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। রেলপথে এই মর্মান্তিক ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
রেল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী সংস্থা আদিফ (ADIF) জানায়, কর্ডোবা শহরের নিকটবর্তী আদামুজ এলাকার কাছে মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি উচ্চগতির ট্রেন হঠাৎ লাইনচ্যুত হয়ে পাশের রেললাইনে চলে যায়। ঠিক সেই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা মাদ্রিদ থেকে হুয়েলভাগামী আরেকটি ট্রেনও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে লাইনচ্যুত হয়। দুটি ট্রেনের এই সংঘর্ষেই ঘটে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি।
আন্দালুসিয়ার জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাইনচ্যুত বগিগুলো থেকে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন। রাতভর উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আরও যাত্রী উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে। গুরুতর আহতদের কর্ডোবা, সেভিল ও মালাগার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আদিফের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মালাগা থেকে ট্রেনটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে যাত্রা শুরু করে এবং মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই দুর্ঘটনার শিকার হয়। দুর্ঘটনার কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, সিগন্যাল বিপর্যয় কিংবা মানবিক ভুল—সব দিক মাথায় রেখে তদন্ত শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যকার সব ধরনের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলো রাতভর খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রী ও নিহতদের স্বজনদের সহায়তায় মাদ্রিদের আতুচা, সেভিল, কর্ডোবা, মালাগা ও হুয়েলভা স্টেশনে বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
মালাগা রুটে ট্রেন পরিষেবা পরিচালনাকারী বেসরকারি রেল কোম্পানি ইরিয়ো (Iryo) দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী ট্রেনটিতে প্রায় ৩০০ যাত্রী ছিলেন। তাদের অনেকেই ব্যবসা, শিক্ষা ও পারিবারিক প্রয়োজনে ভ্রমণ করছিলেন।রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিভিই (RTVE)–এর সাংবাদিক সালভাদর হিমেনেজ, দুর্ঘটনাকবলিত একটি ট্রেনে ছিলেন। তিনি জানান, সংঘর্ষের মুহূর্তটি ছিল “ভূমিকম্পের মতো”।
তিনি বলেন, “আমি ট্রেনের প্রথম বগিতে ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দ আর প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভব করি। মনে হচ্ছিল সবকিছু কেঁপে উঠছে। তখনই বুঝতে পারি, ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে।”
এই দুর্ঘটনায় স্পেনজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্পেনের রাজা ফেলিপে ষষ্ঠ ও রানি লেতিসিয়া এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। রাজপ্রাসাদের পক্ষ থেকে এক্সে জানানো হয়,“এই মর্মান্তিক ঘটনায় যারা প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাই। আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি।”
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই সরকার জরুরি সেবাদানকারী সংস্থা, রেল কর্তৃপক্ষ ও আঞ্চলিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। তিনি জানান, আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ দ্রুত উদঘাটনে সরকার বদ্ধপরিকর।
অন্যদিকে, আন্দালুসিয়ার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট হুয়ানমা মোরেনো নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, এই কঠিন সময়ে আঞ্চলিক সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকবে।
সূত্র: বিবিসি
Leave a comment