আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত। আরবি ভাষায় এ রাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’, অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত। ফারসি শব্দ ‘শবে বরাত’-এর অর্থ মুক্তির রজনী।
মুসলিম উম্মাহর কাছে এই রাতটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, কারণ হাদিস শরিফে এ রাতে আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত, ক্ষমা ও মাগফিরাত নাজিল হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
বিখ্যাত সাহাবি মুয়াজ বিন জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন,
“আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির দিকে রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
— (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, শবে বরাতের ইবাদত মূলত ব্যক্তিগত ও নীরব হওয়াই সুন্নাহসম্মত। কোনো নির্দিষ্ট ধরাবাঁধা ইবাদত চাপিয়ে না দিয়ে নবীজি (স.) যেভাবে আমল করেছেন, সেভাবেই এ রাত কাটানো উত্তম। নিচে শবে বরাতের সুন্নাহভিত্তিক ৬টি গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হলো।
১. দীর্ঘ নফল নামাজ ও দীর্ঘ সেজদা
শবে বরাতে নফল নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ (স.) এ রাতে দীর্ঘ সময় সেজদায় থাকতেন (বায়হাকি)। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়, বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দীর্ঘ কেরাত ও মনোযোগপূর্ণ সেজদার মাধ্যমে নফল নামাজ আদায় করা উত্তম।
২. তাওবা ও ইস্তেগফার
এই রাতের অন্যতম প্রধান আমল হলো খাঁটি তাওবা ও ইস্তেগফার। হাদিসে এসেছে, এ রাতে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের ডেকে বলেন—ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেউ আছে কি না, আমি তাকে ক্ষমা করব। অতীতের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে পাপ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করা এই রাতের মূল শিক্ষা।
৩. বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত
নামাজ ও দোয়ার পাশাপাশি কোরআন তেলাওয়াত শবে বরাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কোরআন আল্লাহর বাণী—এটি তেলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তর প্রশান্ত হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জিত হয়। অর্থ বুঝে ধীরে ধীরে তেলাওয়াত করলে এই রাতের ইবাদত আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
৪. ১৫ই শাবানের রোজা রাখা
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে ১৫ই শাবানের রোজা রাখার কথা এসেছে। যদিও সনদের দিক থেকে এটি দুর্বল, তবে বহু আলেম ফজিলতের আশায় এ রোজা রাখার অনুমতি দিয়েছেন। পাশাপাশি এটি আইয়ামে বিজ (চন্দ্রমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) নফল রোজার অন্তর্ভুক্ত হিসেবেও আদায় করা যায়।
৫. জিকির-আজকার ও দুরুদ পাঠ
নফল নামাজের ফাঁকে ফাঁকে জিকির, তাসবিহ, তাহলিল ও দুরুদ শরিফ পাঠ করা এই রাতের বরকত বৃদ্ধি করে। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” এবং দরুদ পাঠের মাধ্যমে অন্তর আল্লাহর স্মরণে সজীব থাকে।
৬. হিংসা ও শিরক থেকে অন্তর পবিত্র রাখা
হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারীরা এ রাতে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। তাই শবে বরাতের আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হলো—অন্তর থেকে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা দূর করা। মানুষকে ক্ষমা করা, সম্পর্ক ঠিক করা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা এ রাতের মূল বার্তা।
সতর্কতা ও বর্জনীয় বিষয়- শবে বরাতে কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে বিশেষ নামাজ পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। প্রচলিত বিদআত, বানোয়াট আমল, আতশবাজি, অতিরিক্ত আলোকসজ্জা কিংবা দলবদ্ধভাবে উচ্চস্বরে জিকির—এসব বিষয় পরিহার করা জরুরি। সুন্নাহর অনুসরণে নীরবে, একাগ্রচিত্তে ইবাদত করাই উত্তম।
শবে বরাত আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক অনন্য সুযোগ। আসুন, লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা পরিহার করে বিশুদ্ধ নিয়ত ও সুন্নাহভিত্তিক আমলের মাধ্যমে এই রাতের বরকত ও মাগফিরাত অর্জনে সচেষ্ট হই।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শবে বরাতের যথাযথ ফজিলত লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
Leave a comment