রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এখন কেবল গোলাবারুদ আর আধুনিক মারণাস্ত্রের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। রণক্ষেত্রে দুই পক্ষই ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করায় সম্মুখসমরে থাকা সেনাদের কাছে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনগুলোতে উভয় পক্ষের সেনাদের মধ্যে চরম খাদ্যাভাব ও অপুষ্টির এক করুণ চিত্র ফুটে উঠছে।
সম্প্রতি ইউক্রেনের ১৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের চারজন কঙ্কালসার সেনার ছবিসামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, প্রায় ১৭ দিন কোনো খাবার ছাড়াই তারা ফ্রন্টলাইনে টিকে ছিলেন। সেনাদের স্বজনদের দাবি, যোদ্ধারা ক্ষুধার জ্বালায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন এবং তৃষ্ণা মেটাতে বৃষ্টির পানি পান করছেন। দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওসকিল নদীর পূর্ব তীরে আটকে পড়া এসব সেনারা রুশ হামলায় সংযোগকারী সেতুগুলো ধ্বংস হওয়ার পর কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
কিয়েভে চিকিৎসাধীন ওলেক্সান্দর নামে এক সেনা আল-জাজিরাকে জানান, “সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেবল কিছু চকলেট বার আর ওটমিল খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়। পরিবারের চেয়েও তখন বেশি মনে পড়ে এক বেলা গরম খাবারের কথা।”
আধুনিক ড্রোন যুদ্ধ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ফ্রন্টলাইনের ২৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকায় ট্রাক বা সাঁজোয়া যান নিয়ে যাতায়াত এখন আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একেকটি সামরিক বাঙ্কার এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়েছে। আকাশপথে ভারী ড্রোন বা রোবটিক কার্টের মাধ্যমে সামান্য কিছু খাবার ফেলা হলেও তা চাহিদার তুলনায় অতি সামান্য। জার্মান গবেষকদের মতে, ড্রোনের মাধ্যমে রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা এখনও ততটা কার্যকর বা কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি।
একই চিত্র দেখা গেছে রুশ বাহিনীর ক্ষেত্রেও। পর্যাপ্ত খাদ্য ছাড়াই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে পাঠানো হচ্ছে রুশ সেনাদের। ২০২৫ সালের এক তথ্যানুযায়ী, তাজিকিস্তান থেকে আসা এক রুশ যোদ্ধা জানান, লুগানস্কের পরিত্যক্ত গ্রামে এক মাস তাকে সামান্য পানি আর চকলেটের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দনিপ্রো নদীর দ্বীপগুলোতে শত শত রুশ সেনা খাদ্য ও গোলাবারুদ ছাড়াই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এবং চরম খাদ্যাভাবে সেখানে ‘নরমাংস ভক্ষণ’-এর মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটেছে।
সেনাদের অভুক্ত থাকার বিষয়টি নিয়ে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করেছে এবং দায়িত্ব অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট ব্রিগেডের কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ক্ষুধার জ্বালায় সেনাদের আত্মসমর্পণের ঘটনাও বাড়ছে। ২০২৫ সালের মার্চে খারকিভ অঞ্চলে এক রুশ সেনাকে ড্রোনের মাধ্যমে চকলেট পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার ও আত্মসমর্পণের সুযোগ করে দেয় ইউক্রেনীয় বাহিনী।
প্রযুক্তির এই যুদ্ধে সম্মুখসমরের সেনারা এখন কেবল শত্রুর গুলির সঙ্গেই নয়, লড়াই করছেন ক্ষুধার বিরুদ্ধেও। রসদ সরবরাহের এই সংকট যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও সেনাদের মনোবলকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
Leave a comment