যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে যেতে আগ্রহী কিংবা বর্তমানে সেখানে অধ্যয়নরত ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে মার্কিন প্রশাসন। সাম্প্রতিক সময়ে জারি করা একটি আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকায় স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও বিধি লঙ্ঘন করলে শিক্ষার্থী ভিসা (স্টুডেন্ট ভিসা) তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হতে পারে। শুধু তাই নয়, এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
ভারতের মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে প্রচারিত এই নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে শিক্ষার্থীদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের ওপর সরকার কঠোর নজর রাখছে। কোনো শিক্ষার্থী যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ান, গ্রেপ্তার হন বা স্থানীয় আইন ভঙ্গ করেন, তাহলে সেটি সরাসরি তার ভিসার বৈধতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলবে। এমনকি ছোটখাটো আইনি জটিলতাও ভবিষ্যতে বড় সমস্যায় রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সময় আইন মেনে চলা শুধু আনুষ্ঠানিক দায় নয়, বরং ভিসা বহাল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, মাদকসংক্রান্ত অপরাধ, সহিংসতা, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ভঙ্গের মতো ঘটনাও ভিসা বাতিলের কারণ হতে পারে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষায়, এসব ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সতর্ক করা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী যদি আইন ভাঙার কারণে ভিসা হারান, তাহলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধরনের ভিসা পাওয়াও অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি ভুল সিদ্ধান্ত বা অসতর্ক আচরণ দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও কর্মজীবনের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ, কাজ বা বসবাসের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। শিক্ষার্থীদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মাবলি ভালোভাবে জেনে নেওয়া এবং প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ গ্রহণ করা। বিশেষ করে পার্ট-টাইম কাজ, ইন্টার্নশিপ বা ক্যাম্পাসের বাইরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভিসার শর্ত মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশিকার শেষাংশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে—মার্কিন ভিসা কোনো মৌলিক অধিকার নয়; এটি একটি বিশেষ সুবিধা মাত্র। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যে কোনো সময় এই সুবিধা প্রত্যাহার করার পূর্ণ ক্ষমতা রাখে। তাই ভিসাধারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আইনানুগ আচরণ প্রত্যাশা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কবার্তা যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন ও ভিসা নীতির কঠোরতারই প্রতিফলন। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর অভিবাসন নীতিমালায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রেও।
ইতোমধ্যে অনেক ভারতীয় নাগরিক ও শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা, ভিসা নবায়নে বিলম্ব কিংবা হঠাৎ করে ভিসা বাতিলের মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন বলে জানা গেছে। ফলে নতুন এই নির্দেশিকাকে ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি আগাম সতর্কতা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক এই কড়া অবস্থান তাদের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আইন, ভিসার শর্ত ও স্থানীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা অপরিহার্য। সঠিক প্রস্তুতি ও দায়িত্বশীল আচরণই পারে শিক্ষার্থী ভিসা-সংক্রান্ত ঝুঁকি কমাতে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আগ্রহী ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—আইন মেনে চলুন, নিয়ম ভাঙবেন না, এবং ভিসাকে একটি অস্থায়ী সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। এতে শুধু বর্তমান পড়াশোনাই নয়, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক সুযোগও সুরক্ষিত থাকবে।
Leave a comment