মানুষের জীবনে যেমন বসন্ত এসে প্রকৃতিকে নব রূপে সজ্জিত করে, তেমনি মাহে রমজান আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে আমলের জগতে এনে দেয় এক নতুন জাগরণ। এটি কেবল উপবাসের মাস নয়; বরং আত্মসংযম, ক্ষমা, দয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ।
শাবান মাসের পরই মুমিনের প্রতীক্ষিত এই মাসের আগমন ঘটে—যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র কোরআন। তাকওয়া অর্জন, গুনাহ পরিত্যাগ এবং নেক আমলে অগ্রগামী হওয়ার এক অনন্য সময় এটি।
আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন, যা ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন,“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের প্রত্যাশা রেখে রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার পূর্বের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে।”
— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজান পালন করবে, তার বিগত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।”
— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০৯)
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতের মাধ্যমে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সাহরি, ইফতার, তারাবি, তাহাজ্জুদ, তিলাওয়াত, জিকির—সবই বান্দাকে তাকওয়ার উচ্চতায় উন্নীত করে।
রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আকাশে ধ্বনিত হয় আহ্বান— “ওহে কল্যাণ অন্বেষী! সুসংবাদ গ্রহণ করো। ওহে অকল্যাণের পথিক! নিবৃত্ত হও।”
— (তিরমিজি, হাদিস: ৬৮২)
এই আহ্বান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রমজান কেবল সময়ের পরিবর্তন নয়, এটি জীবন পরিবর্তনেরও সুযোগ।
রমজানের শেষ দশক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ সময় লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের নির্দেশ রয়েছে—যে রজনী হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। মহানবী (সা.) বলেন,“এই মহিমান্বিত মাসে একটি রজনী রয়েছে, যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে যেন সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।” — (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৬৪৪)
অতএব, শেষ দশকে ইবাদতে অধিক মনোযোগী হওয়া, অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা কমানো এবং আধ্যাত্মিক মনোসংযোগ বাড়ানো জরুরি।
রমজান সহমর্মিতা ও মানবিকতার মাস। অথচ এ সময় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পণ্য মজুদ বা খাদ্যে ভেজাল—এসব অনৈতিক আচরণ মারাত্মক গর্হিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানদের ওপর দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পণ্য মজুদ করে, সে গুনাহগার।”
— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৮৬১৭)
রমজানের শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিও আহ্বান জানায়।
রমজানকে ফলপ্রসূ করতে আগাম প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি। জীবনের নতুন রুটিন নির্ধারণ, সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং ইবাদতের পরিকল্পনা গ্রহণ—এসবই বরকতময় মাসটিকে অর্থবহ করে তোলে।
গল্প-গুজব, অযথা ডিভাইস ব্যবহার ও অনর্থক ব্যস্ততা থেকে বিরত থেকে দোয়া-দরুদ, তাওবা-ইস্তিগফার ও নফল ইবাদতে মনোনিবেশ করা উচিত।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে, মহানবী (সা.) মিম্বারে আরোহণ করে তিনবার “আমিন” বলেন। এর একটি ছিল—“সে ব্যক্তি হতভাগা, যে রমজান পেল, অথচ তার গুনাহ মাফ হলো না।”
— (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৭৪৫১)
এই সতর্কবাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রমজান একটি ক্ষণস্থায়ী সুযোগ। এটি আসবে, আবার চলে যাবে। জীবনও তেমনি একদিন সমাপ্ত হবে।
বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে রমজান আগমনের আগেই প্রস্তুতি নেয় এবং বরকতময় প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগায়। আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও নেক আমলের মাধ্যমে রমজান হোক আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আল্লাহ আমাদের এই মহিমান্বিত মাসের পূর্ণ কল্যাণ লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
Leave a comment