দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে মার্কিন সামরিক ও নৌ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। রোববার ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সংসদ অধিবেশনে গালিবাফ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালায়, তাহলে দখলকৃত ভূখণ্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও নৌ-পরিবহনের কেন্দ্রগুলো আমাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।” তাঁর বক্তব্যে ‘দখলকৃত ভূখণ্ড’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত ইসরায়েলকে বোঝাতে ইরান ব্যবহার করে থাকে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং ফিলিস্তিনের দখলকৃত অংশ হিসেবে উল্লেখ করে।
এই হুঁশিয়ারির মধ্য দিয়ে ইরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে যদি ওয়াশিংটন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তবে তার জবাব হবে যুদ্ধ।
ইরানজুড়ে চলমান বিক্ষোভকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যদিও সরকারিভাবে পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি।
রোববার দেশটির পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, গত রাতেই “দাঙ্গার সঙ্গে জড়িত মূল গোষ্ঠীগুলোর গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের” গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের সংখ্যা বা পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি, যা মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত কয়েক দিনে একাধিকবার ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন। তিনি তেহরানকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে সতর্ক করেছেন এবং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জনগণের পাশে রয়েছে। শনিবার ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য ওয়াশিংটন প্রস্তুত রয়েছে।
এই বক্তব্যগুলোকে তেহরান সরাসরি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। ফলে ট্রাম্পের মন্তব্য এবং সম্ভাব্য মার্কিন পদক্ষেপ ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ সংকট ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক ইসরায়েলি সূত্র। তাদের মতে, ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন যখন চরমে, তখন কোনো বাহ্যিক সামরিক পদক্ষেপ গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
শনিবার ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেই বৈঠকে কী ধরনের সিদ্ধান্ত বা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
গত জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের একটি সীমিত যুদ্ধ হয়েছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলায় অংশ নেয়। সেই স্মৃতি এখনও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বিস্ফোরণপ্রবণ করে রেখেছে।
শনিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ হয়। এক মার্কিন কর্মকর্তা এই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আলোচনায় ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উঠে আসে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
ইসরায়েল এখনো প্রকাশ্যে বলছে যে তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এই কারণেই তেহরান ও তেল আবিবের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র বৈরিতা বিরাজ করছে।
ইরানে চলমান বিক্ষোভ, যুক্তরাষ্ট্রের কড়া বক্তব্য এবং তেহরানের পাল্টা হুমকি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই উত্তেজনা কূটনৈতিক পথে প্রশমিত হয়, নাকি আবারও অঞ্চলটি এক ভয়াবহ সামরিক সংঘর্ষের দিকে এগিয়ে যায়।
Leave a comment