Home Uncategorized পানি চাইলে খাওয়ানো হয় মদ ও প্রস্রাব, রোজা অবস্থায় মুসলিম নারীকে হত্যার অভিযোগ
Uncategorized

পানি চাইলে খাওয়ানো হয় মদ ও প্রস্রাব, রোজা অবস্থায় মুসলিম নারীকে হত্যার অভিযোগ

Share
Share

ভারতের বিহার রাজ্যে রমজান মাসে রোজা রাখা অবস্থায় ন্যায়বিচারের আশায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়েছিলেন এক মুসলিম নারী। কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলই শেষ পর্যন্ত তার জন্য হয়ে ওঠে নির্মমতার মঞ্চ। গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হওয়ার কয়েকদিন পর হাসপাতালে মারা গেছেন রওশন খাতুন নামে ওই নারী। ঘটনাটি দেশজুড়ে মানবাধিকার ও সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, বিহারের মধুবনী জেলার ঘোগারডিহা ব্লকের আমহি গ্রামে ঘটনাটি ঘটেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্থানীয় একটি বিরোধ মেটানোর জন্য রওশন খাতুন গ্রাম প্রধান কুমারী দেবীর কাছে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি উল্টো আক্রমণের শিকার হন।

গ্রামবাসীদের দাবি, রওশন খাতুন তার স্বামীর সঙ্গে জড়িত একটি স্থানীয় সমস্যার সমাধান চাইতে গ্রাম প্রধানের কাছে যান। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রায়ই স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মানুষ গ্রাম প্রধান বা পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের দ্বারস্থ হন।

তবে অভিযোগ উঠেছে, রওশন খাতুন সেখানে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, গ্রাম প্রধানের ছেলে মনু সিং এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য তাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করে।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন,“তিনি বিচার চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার কথা শোনার বদলে কয়েকজন তাকে মারধর শুরু করে। পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত ভয়াবহ ছিল।”

অন্য এক বাসিন্দা জানান, হামলার সময় অনেক মানুষ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কেউ পরিস্থিতি থামাতে পারেনি।
তার ভাষায়, “তিনি অসহায়ভাবে সাহায্য চাইছিলেন, কিন্তু মারধর থামেনি।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, হামলাকারীরা রওশন খাতুনকে একটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে যে তিনি বারবার হামলাকারীদের থামতে অনুরোধ করছিলেন।

কিছু স্থানীয় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার সময় রওশন খাতুন রমজানের রোজা পালন করছিলেন। তিনি পানি চাইলে তাকে জোর করে অপমানজনক একটি মিশ্রণ পান করানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেই মিশ্রণে মদ ও প্রস্রাব ছিল।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, এই অভিযোগের সব দিক এখনো যাচাই করা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্তকারী দলের এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন,“রোজা রাখা এবং পানি চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কিছু প্রতিবেদন আমরা পেয়েছি। তবে সব তথ্য এখনো যাচাই করা হয়নি। তদন্ত চলছে এবং প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”

২৮ ফেব্রুয়ারি হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় রওশন খাতুনকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে তাকে পাটনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ১ মার্চ তিনি মারা যান। তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর মধুবনী জেলায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন সংগঠন ঘটনার বিচার দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

নিহত রওশন খাতুনের স্বামী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

স্থানীয় মনসুরি সম্প্রদায়ের রাজ্য সভাপতি অজয় মনসুরি বলেন,“আমরা এই ঘটনার বিচার চাই। যে কোনো পর্যায়ে গিয়ে আমরা ন্যায়বিচারের জন্য লড়ব। দোষীদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।”

ঘটনার পর পুলিশ একটি এফআইআর দায়ের করেছে এবং তদন্ত শুরু করেছে। গ্রাম প্রধানের ছেলে মনু সিংকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

একজন তদন্ত কর্মকর্তা বলেন,“আমরা গ্রাম প্রধানের ছেলেকে আটক করেছি। ঘটনার সময় যারা উপস্থিত ছিল তাদের সবাইকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রমাণের ভিত্তিতে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে।”

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমহি গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সতর্ক রয়েছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অনেক মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দা বলেছেন, এটি গ্রামীণ অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন,“মানুষ গ্রাম প্রধানদের কাছে যায় এই বিশ্বাসে যে তারা সমস্যা সমাধান করবেন। কিন্তু এই ঘটনার পর অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।”

এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা শোক প্রকাশ করে বলেন, “রওশন খাতুন একজন দরিদ্র নারী ছিলেন। তিনি সাহায্য চাইতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যু আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। আমরা চাই এই ঘটনার সঠিক বিচার হোক।”

রওশন খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় এখন পুরো মধুবনী জেলা জুড়ে শোক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে স্থানীয়দের দাবি, এই নির্মম ঘটনার বিচার না হলে মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়বে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

ডিউটি ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস, চিকিৎসকের লাইসেন্স স্থগিত

সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় ডিউটি ফাঁকি দিয়ে বেসরকারি চেম্বারে রোগী দেখার অভিযোগে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের...

তুরস্কে বাংলাদেশি বাবা-ছেলের রহস্যজনক মৃত্যু

তুরস্কে ঘুমন্ত অবস্থায় রহস্যজনকভাবে এক বাংলাদেশি বাবা ও তাঁর ছেলের মৃত্যু হয়েছে। একই বাসায় থাকা আরেকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। প্রাথমিকভাবে...

Related Articles

দেশের সবচেয়ে কম ব্যাংক ঋণ সিলেটে, শীর্ষে ঢাকা বিভাগ

দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিতরণ করা ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম ঋণ রয়েছে...

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সত্যতার প্রমাণ পাওয়ার অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ...

হরমুজ প্রণালীতে তেল ট্যাংকারে ভয়াবহ হামলা: নিহত ২

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালীতে এবার মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং...

ইরানে এক হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় ইরানে প্রাণহানির সংখ্যা চার দিনের মাথায়...