জুলাই–আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি ও ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেছেন তারা।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার–এর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলের সামনে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারা এ দাবি করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শুনানির শুরুতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন। তবে ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন নামঞ্জুর করেন। এরপর প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আনা পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আদালতে পাঠ করা হয়।
অভিযোগ পাঠ শেষে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ কাঠগড়ায় দাঁড়ানো দুই আসামিকে জিজ্ঞেস করেন, তারা দোষ স্বীকার করেন কি না। জবাবে দুজনই একযোগে বলেন,“আমরা নির্দোষ। ট্রাইব্যুনালের কাছে আমরা ন্যায়বিচার চাই।”
এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে কৌশলগত ও নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ১৯ জুলাই দুইজনের মধ্যে ফোনালাপের একপর্যায়ে আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের দমনে রাতেই কারফিউ জারি করে “শেষ করে দেওয়ার” কথা বলেন। এই সিদ্ধান্ত ও ধারাবাহিক উসকানির ফলেই বহু ছাত্র ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান।
দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তাদের জ্ঞাতসারেই ২৩ জুলাই মিরপুরে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় কর্মীরা তাদের প্ররোচনায় সেখানে প্রাণঘাতী অভিযান চালায়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, তারা মারণাস্ত্র ব্যবহারে উসকানি ও ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। এর ফলেই ২৮ জুলাই মিরপুর–১০ এলাকায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
চতুর্থ অভিযোগে অভিযোগ করা হয়, ৪ আগস্ট কারফিউ জারির মধ্য দিয়ে মিরপুর–১ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ–সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলায় আকাশ, সেতু, আলভীসহ ১২ জন নিহত হন।
পঞ্চম ও শেষ অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। সালমান ও আনিসুলের নির্দেশে প্রশাসন ও দলীয় বাহিনীর অভিযানে মিরপুর–২, ১০ ও ১৩ নম্বর এলাকায় আল-আমিন, আশরাফুল, সাব্বির, রিতাসহ অন্তত ১৬ জন নিহত হন।
এর আগে ৪ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ আমলে নেয়। একই দিন সকালে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়।
এই মামলাকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুলাই–আগস্টের সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ট্রাইব্যুনালের এই বিচার বাংলাদেশে মানবাধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নে বড় একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
Leave a comment