Home আন্তর্জাতিক নেপালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তীব্র,সীমান্ত বন্ধ করলো ভারত
আন্তর্জাতিক

নেপালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তীব্র,সীমান্ত বন্ধ করলো ভারত

Share
Share

ভারতের সীমান্তঘেঁষা নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। মসজিদে ভাঙচুরের ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে নেপালের পারসা জেলার বীরগঞ্জ শহরে কারফিউ জারি করা হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশ ভারত জরুরি পরিষেবা ছাড়া নেপালের সঙ্গে সব ধরনের সীমান্ত পারাপার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। মঙ্গলবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে নেপালের ধানুশা ও পারসা জেলায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেওয়ায় সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের বিহার রাজ্যের রক্সৌল জেলার সংলগ্ন নেপালের বীরগঞ্জ শহর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

নেপালের ধানুশা জেলার কামালা পৌরসভায় হায়দার আনসারি ও আমানত আনসারি নামে দুই ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই ভিডিওতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে—এমন মন্তব্য ছিল। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়লে তা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এবং ধানুশা ও পারসা জেলায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা ওই দুই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তাদের দাবি ছিল, ভিডিওটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য হুমকি তৈরি করেছে। তবে এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরই কামালা পৌরসভার সাখুয়া মারান এলাকায় একটি মসজিদে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে নেমে আসে।

বিক্ষোভ চলাকালে বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন অভিযোগ তোলে যে, তাদের দেবদেবীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান ও গুজব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অল্প সময়ের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভকারীরা পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে এবং স্থানীয় থানায় ভাঙচুর চালায়। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় অর্ধডজন কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বীরগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় কারফিউ কার্যকর রয়েছে।

নেপালে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পর ভারতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি) নেপালের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সীমান্ত কার্যত বন্ধ করে দেয়। জরুরি পরিষেবা ছাড়া সাধারণ মানুষের সীমান্ত পারাপার সম্পূর্ণভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

ভারত ও নেপালকে সংযুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ মৈত্রী সেতুতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত পার হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে কঠোরভাবে তল্লাশি করা হচ্ছে। নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে সীমান্ত এলাকায় ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হয়েছে।

এসএসবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মৈত্রী সেতুর পাশাপাশি সহাদেওয়া, মহাদেওয়া, পান্তোকা, সিওয়ান টোলা ও মুশারওয়া এলাকাতেও টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় যে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রতিটি কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।

নেপালে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে সেখানে কর্মরত বহু ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিক নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। সীমান্তে অপেক্ষমাণ ভারতীয় নাগরিক রাকেশ এনডিটিভিকে বলেন, বীরগঞ্জ শহরে দোকানপাট ও বাজার সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তার ভাষায়, “এমন পরিস্থিতিতে সেখানে থাকার কোনো মানে হয় না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কাজে ফিরব।”

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেপালের নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং গুজবে কান না দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বিশ্লেষকদের মতে, নেপালের এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। ভারত-নেপাল সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত ও জনসমাগমপূর্ণ। সেখানে হঠাৎ সীমান্ত বন্ধ হওয়ায় দুই দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব পড়ছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নেপাল ও ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে সীমান্ত বাণিজ্য, শ্রম চলাচল এবং দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে নেপালের নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত কারফিউ ও কঠোর নজরদারি বজায় থাকবে। ভারতও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
সূত্র: এনডিটিভি

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

প্রসিকিউটররা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা : চিফ প্রসিকিউটর

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, তার দায়িত্বকালীন সময়ে কোনো প্রসিকিউটর বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মঙ্গলবার (২৪...

মব সন্ত্রাস বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ প্রশংসনীয়: রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, মব সন্ত্রাস বন্ধে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া সরকারের প্রথম পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাতে বঙ্গভবনে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া...

Related Articles

বিয়ের মঞ্চে কনেকে গুলি, অভিযুক্ত পলাতক

ভারতের বিহার রাজ্যের বক্সার জেলায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে মালাবদলের সময় কনেকে গুলি...

আজ রাজকীয় আয়োজনে বিয়ে করছেন বিজয়-রাশমিকা

দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় দুই তারকা বিজয় দেবেরাকোন্ডা ও রাশমিকা মান্দানা আজ বিয়ের...

ইসরায়েলের সংসদে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত নরেন্দ্র মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রীয় সফরে ইসরায়েল গিয়ে দেশটির পার্লামেন্ট ক্নেসেটে ভাষণ...

এপস্টিন বিতর্ক, রুশ মহিলাদের সঙ্গে সম্পর্কের কথা স্বীকার করলেন গেটস

মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সম্পর্ক নিয়ে...