২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রণীত নতুন পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস উপস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রকাশিত অনলাইন পাঠ্যবইয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে মেজর জিয়াউর রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা শিক্ষাঙ্গন ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এনসিটিবির ওয়েবসাইটে রোববার (২৮ ডিসেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ের অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধানরঞ্জন রায় পোদ্দার যৌথভাবে অনলাইন সংস্করণ উন্মুক্ত করেন। কর্তৃপক্ষ জানায়, ১ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে শিক্ষার্থীদের হাতে এসব বই পৌঁছে দেওয়া হবে।
নতুন পাঠ্যবইয়ের মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, পরদিন ২৭ মার্চ তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। পাঠ্যবইয়ের এই বক্তব্যকে ঘিরেই মূলত বিতর্কের সূচনা হয়েছে।
শুধু ষষ্ঠ শ্রেণিই নয়, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে ইতিহাস উপস্থাপনায় ভিন্নতা লক্ষ্য করা গেছে। এসব বইয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভূমিকা সীমিত আকারে তুলে ধরা হয়েছে অথবা কিছু ক্ষেত্রে অনুপস্থিত রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
তবে সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে এবং সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে আরও বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরদিন ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে আবারও ঘোষণা পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। যদিও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে—এ কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও, সেই সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নাম হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায়নি।
অষ্টম শ্রেণির বইয়ে অসহযোগ আন্দোলনে আওয়ামী লীগের ভূমিকার কথা থাকলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ৭ মার্চের ভাষণ বিষয়ে একটি পাঠে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তব্যের কিছু অংশ উদ্ধৃত করা হয়েছে, তবে পুরো ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এই পরিবর্তিত উপস্থাপনাকে ঘিরে শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে। একদল মনে করছেন, ইতিহাসের একাধিক দিক তুলে ধরা শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক হতে পারে, কারণ এতে তারা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা লাভ করবে। অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে ইতিহাস উপস্থাপন করলে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে এনসিটিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাঠ্যবইগুলো নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এখানে ঘটনাপ্রবাহকে সময়ানুক্রমিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বোর্ডের কর্মকর্তারা দাবি করেন, পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত তথ্যগুলো বিভিন্ন ঐতিহাসিক উৎস ও গবেষণার ভিত্তিতে সংযোজিত হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নতুন শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা ও বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা। সে কারণেই ইতিহাসের নির্দিষ্ট কিছু অধ্যায় আগের চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে বিতর্ক ও মতভেদ থাকলে তা পর্যালোচনার সুযোগও রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে জড়িত। পাঠ্যবইয়ে এই ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপিত হবে, তা শুধু শিক্ষা নয়—জাতীয় পরিচয় ও মূল্যবোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের পরপরই বিষয়টি জনআলোচনায় উঠে আসা অস্বাভাবিক নয়।
এখন দেখার বিষয়, শিক্ষাবিদদের মতামত ও জনপ্রতিক্রিয়ার আলোকে পাঠ্যবইয়ের এই অংশে ভবিষ্যতে কোনো সংশোধন আনা হয় কি না। আপাতত, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা নতুন পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে তাদের প্রাথমিক ধারণা গড়ে তুলবে—যা আগামী দিনে ইতিহাসচর্চা ও জাতীয় আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a comment