যুদ্ধাপরাধের গুরুতর অভিযোগ এবং দীর্ঘদিনের তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যেই সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম ওসমান ফারুক আবারও রাজনীতিতে ফিরেছেন। দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে তিনি কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ–তাড়াইল) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। —যা নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
দলীয় সূত্র ও স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের তথ্যমতে, তিনি গত বছরের ৩০ অক্টোবর দেশে ফিরে এলাকায় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন। করিমগঞ্জ সরকারি পাইলট মডেল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় বিএনপির আয়োজিত এক গণসংবর্ধনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে দাবি করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন মহল তাকে মিথ্যা মামলায় জড়াতে চেয়েছিল।
ওসমান ফারুক তার রাজনৈতিক জীবনের পটভূমিও তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বব্যাংকে উচ্চপদে কর্মরত থাকা অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসনের আহ্বানে দেশে ফিরে রাজনীতিতে যুক্ত হন বলে জানান। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাকে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু ওসমান ফারুকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ । মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা পূর্বে জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ
চলাকালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধ সমর্থক ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের শনাক্তকরণে ভূমিকা, নির্যাতন-নিপীড়নে সহায়তা এবং নারী নির্যাতনের অভিযোগ।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন গণকবর, পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের অবস্থান, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী পরিবারের সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রায় ৪০–৪৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দিতে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে তারা দাবি করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে সাক্ষীদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি এবং তদন্ত এখনো চলমান।
এই পরিস্থিতিতে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত এবং তদন্তাধীন একজন ব্যক্তি কীভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন। এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়া, তদন্তের গতি এবং বিচারিক অবস্থান—সবই এখন পর্যবেক্ষকদের আলোচনায়।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে তার দাখিল করা হলফনামায় ব্যক্তিগত সম্পদের তথ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৬ কোটি ৬৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। নগদ অর্থ ৩৪ লাখ ৭১ হাজার ৫০০ টাকা, বিদেশি মুদ্রায় ১১ লাখ ৩০ হাজার ৬০৭ মার্কিন ডলার রয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে ৫৫ হাজার ডলার মূল্যের স্থাবর সম্পদের তথ্যও রয়েছে।
এছাড়া ঢাকার উত্তরা ও গুলশানে চারটি অ্যাপার্টমেন্ট, এক একর অকৃষিজমি, করিমগঞ্জে একটি ভবন, যানবাহন, ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সম্পদের বিবরণ হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আয়কর প্রদানের ঘরে শূন্য দেখানো হয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়। নাগরিকত্ব বিষয়ে তিনি দাবি করেছেন, পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হলেও বর্তমানে দ্বৈত নাগরিক নন।
তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, যে এলাকায় তিনি বসবাস করতেন, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন স্থানে গণকবর ও নির্যাতনকক্ষের অবস্থান চিহ্নিত হয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোকে তারা গুরুত্বসহকারে যাচাই করছেন।
একদিকে রাজনৈতিক দলীয় মনোনয়ন ও নির্বাচনী প্রচারণা, অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান—এই দুই বাস্তবতা ওসমান ফারুককে ঘিরে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিষয়টি এখন শুধু একটি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং ইতিহাস, বিচারপ্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নও এতে জড়িয়ে পড়েছে।
Leave a comment