সরকারবিরোধী সহিংস বিক্ষোভে জড়িত নাগরিকদের আত্মসমর্পণের জন্য তিন দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ইরান। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করলে শাস্তির ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখানো হবে। তবে সময়সীমা অতিক্রমের পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের জাতীয় পুলিশ সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের উদ্দেশে এই আল্টিমেটাম জারি করেছে। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেক মানুষ ‘প্রতারিত হয়ে’ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছেন এবং তারা শত্রুপক্ষের সেনা নন।
ইরানের জাতীয় পুলিশের প্রধান আহমাদ-রেজা রাদান এক বক্তব্যে বলেন, “যেসব তরুণ অজ্ঞাতসারে দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছেন, তারা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শত্রু নন। তারা বিভ্রান্ত মানুষ। যদি তারা তিন দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করেন, তাহলে তাদের প্রতি শাস্তির ক্ষেত্রে সহনশীলতা দেখানো হবে।” তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের লক্ষ্য প্রতিশোধ নয়, বরং শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
গত বছরের ডিসেম্বরের শেষদিকে ইরানে শুরু হয় ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ। অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ক্ষোভ থেকেই প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই তা দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়ে পড়ে এবং সহিংস রূপ ধারণ করে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই সহিংসতায় অন্তত ৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বলেও জানিয়েছে সরকার। যদিও মানবাধিকার সংস্থাগুলো নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাপক দমন-পীড়নের পর ইরানের বিক্ষোভ বর্তমানে অনেকটাই স্তিমিত। তবে তারা অভিযোগ করেছে, আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে এবং ব্যাপক গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করেছে তেহরান।
ইরান সরকার বলছে, বিক্ষোভের শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল, কিন্তু পরে তা ‘দাঙ্গায়’ রূপ নেয়। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলসহ দেশটির প্রধান শত্রু রাষ্ট্রগুলো পরিকল্পিতভাবে এই সহিংসতা উসকে দিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। সরকারবিরোধী এসব কর্মকাণ্ডকে তারা বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, গত সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভ-সংক্রান্ত ঘটনায় প্রায় ৩ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত গ্রেপ্তারের সংখ্যা ২০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে।
এর আগে গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কড়া ভাষায় বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “ফিতনাবাজদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে। দেশি ও বিদেশি অপরাধীরা কোনোভাবেই শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মসমর্পণের এই তিন দিনের আল্টিমেটাম একদিকে যেমন সরকারের শক্ত অবস্থানকে তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সীমিত পরিসরে সমঝোতার পথও খোলা রাখছে। তবে বাস্তবে কতজন এই আহ্বানে সাড়া দেবেন এবং ঘোষিত নমনীয়তা কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
সব মিলিয়ে, ইরানের সাম্প্রতিক এই ঘোষণা দেশটির রাজনৈতিক সংকটের নতুন একটি অধ্যায় নির্দেশ করছে। আত্মসমর্পণের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন শুধু ইরান নয়, আন্তর্জাতিক মহলেরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে।
Leave a comment