Home Uncategorized থানার ভেতরে হুমকি, গ্রেপ্তার ও দ্রুত মুক্তি: মাহদী হাসান ইস্যুতে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন
Uncategorized

থানার ভেতরে হুমকি, গ্রেপ্তার ও দ্রুত মুক্তি: মাহদী হাসান ইস্যুতে আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন

Share
Share

হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা নেতা মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে তার জামিনে মুক্তি নতুন করে দেশে আইনের শাসন ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে।

মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। গত ২ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভেতরে বসে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালামের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলছেন। একপর্যায়ে তিনি বানিয়াচং থানা পোড়ানো এবং এক উপপরিদর্শককে (এসআই) হত্যার প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘তারাই সরকার গঠন করেছেন’ এবং পুলিশ সেই প্রশাসনেরই অংশ।

ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার মতো বক্তব্যের সমালোচনা করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এই প্রেক্ষাপটে শনিবার বিকেলে পুলিশ মাহদী হাসানকে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়া ও হুমকির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।

গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই হবিগঞ্জ ও ঢাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। হবিগঞ্জ সদর থানার সামনে রাতভর অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকেও দ্রুত মুক্তির আলটিমেটাম দেওয়া হয় বলে আন্দোলনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

রোববার সকালে মাহদী হাসানকে হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরপরই তিনি সমর্থকদের নিয়ে শহরে আনন্দ মিছিল করেন। এই মিছিল সামাজিক মাধ্যমে নতুন করে সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন—একজন ব্যক্তি থানার ভেতরে বসে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার পর কীভাবে এত দ্রুত জামিনে মুক্তি পান এবং প্রকাশ্যে মিছিল করার সুযোগ পান।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, পুলিশের সঙ্গে এ ধরনের ভাষায় কথা বলা বা হুমকি দেওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাঁর ভাষায়, “পুলিশকে হেয় বা দুর্বল প্রমাণ করার চেষ্টা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য মোটেও সহায়ক নয়।”

তবে তিনি এটিও উল্লেখ করেন, সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কেবল কথার ভিত্তিতে কাউকে দণ্ডিত করা যায় না। আইনের দৃষ্টিতে কোনো বক্তব্য তখনই স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করা হয়। থানার ভেতরে পুলিশের সঙ্গে কথোপকথনের সময় দেওয়া বক্তব্য আইনি অর্থে স্বীকারোক্তি হিসেবে বিবেচিত নাও হতে পারে বলে তিনি মত দেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকলেও এমন আচরণ সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ক্ষতিকর।

অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, গ্রেপ্তারের পরপরই মুক্তির দাবিতে থানার সামনে রাতভর বিক্ষোভ আইনের শাসনের দুর্বলতারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, “যদি আইন প্রয়োগ সব সময় বাস্তব পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক চাপে নতি স্বীকার করে, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।”

ড. হক মনে করেন, মাহদী হাসানের বক্তব্য কোনো ঘরোয়া পরিবেশে দেওয়া হয়নি; বরং তা ছিল একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সামনে। তাঁর মতে, বক্তব্যের পরিবেশ ও প্রভাব বিবেচনায় নিলে বিষয়টি আইনের চোখে মোটেও হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা একক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও প্রভাব খাটানো, চাপ সৃষ্টি এবং আইন প্রয়োগে শিথিলতার মতো প্রবণতা বারবার ফিরে আসছে। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলেও দলীয় পরিচয়ের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়েও ‘সমন্বয়ক’ পরিচয়ে চাঁদাবাজি, বিশৃঙ্খলা ও প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।

ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আমরা আইনের শাসনের কথা বলি, কিন্তু আইন মান্যকারী সংস্কৃতি গড়ে তোলার মৌলিক বিষয়গুলো মানতে চাই না। ফলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিরা মনে করেন, তারা যা খুশি করতে পারেন।” তাঁর মতে, এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়।

এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার, শায়েস্তাগঞ্জ থানা ও বানিয়াচং থানার ওসিসহ একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর উইংয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, মাহদী হাসানের গ্রেপ্তার ও দ্রুত মুক্তির ঘটনা কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক চাপের প্রভাব এবং আইনের শাসনের বাস্তব চিত্র নিয়ে বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে। এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না মিললে ভবিষ্যতে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা ও জনআস্থা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

১২৩ বারের মতো পেছাল সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় আবারও পিছিয়েছে। এক যুগের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা এই...

ভেনেজুয়েলায় অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হলেন ডেলসি রদ্রিগেজ

ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের...

Related Articles

নির্বাচন পরিচালনায় বিএনপির কমিটি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৪১ সদস্যের...

বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু: রুমিন ফারহানা

দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়াকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখলেও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা...

জেনে নিন এই হ্যান্ডশেকের অর্থ

গতকাল বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাযায় অংশগ্রহণ করতে ও জিয়া পরিবারকে...

মিথ্যা নয়, বাস্তব পরিকল্পনা দেবে জামায়াত: ডা. শফিকুর রহমান

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কখনও সামর্থ্যের...