ইরানে চলমান অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকির জবাবে কঠোর ভাষায় অবস্থান নিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বহিরাগত কোনো চাপ বা হুমকির কাছে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান কখনোই মাথানত করবে না।
শনিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে খামেনি বলেন, “ইরান শত্রুর হুমকিতে কখনোই তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না। যারা দেশের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে বিদেশি শক্তিকে সুযোগ করে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভের নামে সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীকে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সূচনা হয় তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে। ইরানি মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গত রোববার থেকে বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব বিক্ষোভ রাজনৈতিক দাবিতে রূপ নিতে থাকে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি দুই শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পশ্চিম ইরানের কয়েকটি প্রদেশে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে বেশি উত্তপ্ত বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান সরকারকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন। তিনি লেখেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী দমন-পীড়ন চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র তা নীরবে দেখবে না। ট্রাম্পের ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড”—অর্থাৎ প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি করেছে। তার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসনে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অবস্থিত সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।
আয়াতুল্লাহ খামেনি তার ভাষণে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও স্বীকার করেন। তিনি বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাস্তব। অনেক অভিযোগ যৌক্তিক।” তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো এবং সহিংসতা—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও, দাঙ্গাবাজ ও সহিংসতাকারীদের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
নরওয়েভিভিত্তিক কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা হেনগাও জানিয়েছে, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের লরেস্তান ও কুর্দিস্তান প্রদেশে সংঘর্ষ সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, শুধু এক রাতেই ৭৭ জন নতুন করে গ্রেপ্তার হয়েছেন, যার ফলে মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ১৩৩ জনে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২২ সালে নৈতিক পুলিশ হেফাজতে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর এটি ইরানের সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকট। সেই আন্দোলন দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার রেশ এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
বর্তমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার হুমকি, সিরিয়ায় ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন, এবং হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি সামরিক হামলা—সব মিলিয়ে তেহরান কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পরিস্থিতিতে ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাড়তে থাকা উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে আরও বড় সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন সতর্ক দৃষ্টিতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে।
Leave a comment