বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া এক অনন্য ও প্রভাবশালী নাম। তিনি দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে অন্যতম দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা নেত্রী। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা খালেদা জিয়ার শাসনামল একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও সামাজিক সংস্কারের জন্য স্মরণীয়, অন্যদিকে তা বিতর্ক, সংঘাত ও সমালোচনার ঘটনাতেও পরিপূর্ণ।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কখনোই ব্যক্তিগতভাবে পরাজয়ের মুখ দেখেননি। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও লক্ষ্মীপুরের মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতেই জয়ী হন তিনি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চার দশকের এই দীর্ঘ পথচলায় ক্ষমতার উত্থান-পতন, কারাবাস এবং প্রবল রাজনৈতিক বৈরিতার ছাপও স্পষ্ট।
নিচে খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের তিন মেয়াদের ১০টি সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো—
১. সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
আশির দশকে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। এরশাদ পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ২০ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রথম মেয়াদেই দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন, যা তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
২. নারী শিক্ষায় যুগান্তকারী উদ্যোগ
মেয়াদে শিক্ষা খাতে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দেশের সামাজিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষা, ছাত্রী উপবৃত্তি এবং ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করা হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এ সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হার প্রায় ৯৭ শতাংশে পৌঁছায়। যদিও এই সুবিধা মূলত সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ছিল, তবু নারী শিক্ষায় এটি একটি বড় মাইলফলক।
৩. ভ্যাট ব্যবস্থা প্রবর্তন
বিএনপি সরকারের আমলে অর্থনীতিতে বড় সংস্কারের অংশ হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা হয়। ব্যবসায়ী মহলের বিরোধিতা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থাকে বিস্তৃত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়।
৪. ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং বিএনপি জয়ী হয়। তবে সংসদ টিকে ছিল মাত্র ১২ দিন। প্রবল আন্দোলনের মুখে তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
৫. পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ
২০০১ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে পরিবেশ সুরক্ষায় ২০০২ সালে পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ এই সিদ্ধান্ত নেয়, যা আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসা কুড়ায়।
৬. অপারেশন ক্লিনহার্ট
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তৃতীয় মেয়াদের শুরুতেই, ২০০২ সালে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও সহিংস অপরাধের বিস্তার জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। সরকার গঠনের এক বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া স্বীকার করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি।
একই সঙ্গে তিনি সন্ত্রাস দমনে ‘বলিষ্ঠ পদক্ষেপ’ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর মধ্যরাতে, কার্যত ১৭ অক্টোবর থেকে সারা দেশে একযোগে একটি বিশেষ অভিযান শুরু হয়। সরকারিভাবে এটিকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমানে বিজিবি) যৌথ অভিযান হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে পুরো অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী। এই সামরিক নেতৃত্বাধীন অভিযানই ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করাই ছিল অপারেশন ক্লিনহার্টের মূল লক্ষ্য। অভিযানের শুরুতে বিভিন্ন এলাকায় পরিচিত সন্ত্রাসী, চিহ্নিত অপরাধী ও সন্দেহভাজনদের আটক করা হয়। এতে কিছু এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ প্রবণতা কমে আসে বলে সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তবে অভিযান শুরুর পরপরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অভিযানের সময় আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনের বেশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ তাঁর লেখা বইয়ে উল্লেখ করেন, হিসাবভেদে এই মৃত্যুর সংখ্যা ৪০ থেকে ৬৫ জনের মধ্যে হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ সে সময়ের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলেন, অপারেশন ক্লিনহার্ট চলাকালে গণমাধ্যমে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দ ব্যবহার করে বহু মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, “এদের মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ছিল, আবার অভিযানের শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়ার নিজের দলের লোকজনও। সে সময় সমালোচনা হয়েছিল, তিনি দলীয় পরিচয় দেখেননি—দলের কেউ হলেও ছাড় দেননি।”
এই মন্তব্য একদিকে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিলেও, অন্যদিকে অভিযানের বৈধতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে বিতর্ক আরও তীব্র করে তোলে। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ অপারেশন ক্লিনহার্টকে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ হিসেবে আখ্যা দেয়।
প্রায় ৮৪ দিন ধরে চলা এই অভিযান শেষে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এর পরপরই ২০০৩ সালে সরকার ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি অধ্যাদেশ’ জারি করে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে অপারেশন ক্লিনহার্টে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে হেফাজতে মৃত্যুবরণকারীদের পরিবারগুলোর জন্য বিচার চাওয়ার সুযোগও রুদ্ধ হয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সময় ধরে এই দায়মুক্তি আইনটি মানবাধিকার অঙ্গনে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। অবশেষে ২০১২ সালে মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন, যেখানে অপারেশন ক্লিনহার্টে দায়মুক্তি দেওয়া অধ্যাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়। এই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই অধ্যাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করে, যা অপারেশন ক্লিনহার্ট অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
অপারেশন ক্লিনহার্ট তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এক দ্বিমুখী বাস্তবতার প্রতীক। একদিকে এটি ছিল রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ দমনের একটি নজিরবিহীন উদ্যোগ, অন্যদিকে এটি মানবাধিকার, আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের জন্ম দেয়। খালেদা জিয়ার শাসনামলের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে অপারেশন ক্লিনহার্ট আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
৭. র্যাব গঠন
অপারেশন ক্লিনহার্টের পর ২০০৪ সালে গঠিত হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। শুরুতে সন্ত্রাস দমনে বাহিনীটি জনপ্রিয়তা পেলেও পরবর্তী সময়ে ‘ক্রসফায়ার’ ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।
৮. জঙ্গিবাদ ও একুশে আগস্ট হামলা
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের তৃতীয় মেয়াদে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদী তৎপরতার বিস্তার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সময় জেএমবি (জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ) ও হুজিসহ একাধিক ইসলামি মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে গভীর সংকটে ফেলে।
এই মেয়াদের সবচেয়ে ভয়াবহ ও আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট। ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে রাজধানী। ওই হামলায় ২৪ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা’ নামে পরিচিত হয়ে আছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ একে খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদের সবচেয়ে ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হিসেবে আখ্যা দেন। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড ও বোমা হামলা ছিল এই সরকারের সবচেয়ে খারাপ নজির। এটার কোনো ভালো তদন্ত হয় নাই। খুব হেলাফেলা করা হয়েছে। এর ফলেই দুই নেত্রীর মধ্যে রিকনসিলিয়েশনের আর কোনো জায়গা থাকেনি।”
এই হামলার পরও দেশে জঙ্গি তৎপরতা থামেনি। বরং তা আরও সংগঠিত রূপ নেয়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় একযোগে সিরিজ বোমা হামলা চালানো হয়। এসব হামলায় দুইজন নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। সেদিন একই সময়ে হামলার মাধ্যমে জঙ্গিরা দেশে নিজেদের সংঘবদ্ধ উপস্থিতির ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি তারা বিভিন্ন স্থানে প্রচারপত্র বা লিফলেট ছড়িয়ে দেয়, যা রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।
পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, এই সমন্বিত হামলার পেছনে ছিল জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। বিবিসি বাংলার ২০২০ সালের ১৭ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গ্রেপ্তার হওয়া জেএমবি নেতাদের জবানবন্দির বরাতে বলা হয়, জেএমবি গঠিত হয় ১৯৯৮ সালে। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম দুই বছর তারা প্রশিক্ষণ ও দাওয়াতি কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকলেও, ২০০১ সাল থেকেই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা আমির শায়খ আবদুর রহমান গ্রেপ্তারের পর জবানবন্দিতে এসব তথ্য দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে সে সময় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার জঙ্গিদের সঙ্গে নিজেদের কোনো সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসে।
এই সময় রাজশাহী ও নওগাঁ অঞ্চলে জেএমবির আরেক শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম, যিনি ‘বাংলা ভাই’ নামে পরিচিত, প্রকাশ্যে তাণ্ডব চালাতে থাকে। সে সময় বিএনপি-জামায়াত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা দাবি করেছিলেন, ‘বাংলা ভাই’ মূলত মিডিয়ার সৃষ্টি। এই বক্তব্য দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত ২০০৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সরকার জেএমবি ও জেএমজেবি (জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ)–কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে নিষেধাজ্ঞার পরও একই বছরের ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় সারা দেশে মোট ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়।
এরপর পরিস্থিতি মোড় নেয় ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর। ঝালকাঠিতে জঙ্গিদের বোমা হামলায় দুইজন বিচারক নিহত হন। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার সূত্র ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জেএমবির শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। ওই মামলায় ২০০৬ সালের ৬ মার্চ সাতজন জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। একই বছরের ১৬ অক্টোবর একজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
অবশেষে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ মধ্যরাতে জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ সংগঠনটির শীর্ষ ছয় নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদ তাই একদিকে জঙ্গিবাদ দমনে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সূচনা, অন্যদিকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের অভাব নিয়ে গভীর বিতর্কের জন্ম দেয়। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও দেশব্যাপী সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ সেই সময়কে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম অস্থির ও রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে।
৯. দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা
২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি–জামায়াতে ইসলামীর জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় যে ঘটনাগুলো রাষ্ট্রযন্ত্রে গভীর অস্বস্তি ও রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল কুখ্যাত ‘দশ ট্রাক অস্ত্র’ উদ্ধারের ঘটনা। এই ঘটনা শুধু দেশীয় রাজনীতিতেই নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র ও গোলাবারুদের চালান আটক করা হয় ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) জেটিতে সমুদ্রপথে দুটি বড় ট্রলারে করে আনা হয় এই বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার। সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, জেটিতে অস্ত্র খালাসের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের সহায়তায় সেগুলো আটক করা হয়।
উদ্ধার করা অস্ত্রের তালিকা ছিল বিস্ময়কর। এর মধ্যে ছিল চীনের তৈরি একে-৪৭ রাইফেল, সেমি-অটোমেটিক রাইফেল, রকেট লঞ্চার, রকেট শেল, পিস্তল, হ্যান্ড গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ গুলি এবং বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক। এত বিপুল ও আধুনিক অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে কী উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল—তা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ও জল্পনা শুরু হয়।
এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয় বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন। সে সময় ভারতের বিভিন্ন মহল থেকে দাবি করা হয়, দিল্লির চাপের মুখেই বাংলাদেশ সরকার অস্ত্রগুলো আটক করতে বাধ্য হয়। অন্যথায় এসব অস্ত্র ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছাতে পারত।
তবে বিএনপি বরাবরই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির দাবি, সরকার তখনই ব্যবস্থা নিয়েছিল বলেই অস্ত্রগুলো আটক সম্ভব হয়েছে। সরকার যদি চাইত, তাহলে এই চালান নির্বিঘ্নেই পাচার হয়ে যেত। কিন্তু এসব পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেও বাস্তবতা হলো—অস্ত্র উদ্ধারের পর থেকেই বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমশ অবনতির দিকে যায়। বিবিসি বাংলার ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে এ ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনের একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এই ঘটনায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে অস্ত্র চোরাচালানের অভিযোগে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ একযোগে এই দুই মামলার রায় ঘোষণা করে।
অস্ত্র চোরাচালান মামলায় আদালত তৎকালীন জোট সরকারের সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী (যার ফাঁসি অন্য মামলায় কার্যকর হয়েছে), সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একই আসামিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে করা আরেক মামলায় দেওয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
তবে এই মামলার রায়ও শেষ কথা হয়ে থাকেনি। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালতে আপিল ও পুনর্বিচারের ধারায় মামলার চিত্র পাল্টাতে থাকে। গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ত্র চোরাচালানের মামলায় হাইকোর্টের রায়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পান সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরসহ ছয়জন আসামি। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে অস্ত্র আইনের মামলায়ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে একই ছয়জনকে খালাস দেন হাইকোর্ট।
এ ছাড়া ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াসহ পাঁচজনের সাজা হ্রাস করা হয়।
দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা তাই আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি জটিল, বিতর্কিত ও বহুমাত্রিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
১০. দুর্নীতিতে শীর্ষ অবস্থান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ একাধিকবার দুর্নীতির সূচকে শীর্ষে ছিল। এর মধ্যে চার বছরই ছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়, যা তাঁর শাসনামলকে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের তিন মেয়াদ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জটিল ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নারী শিক্ষা ও পরিবেশ রক্ষায় তাঁর অবদান যেমন স্মরণীয় তেমনি জঙ্গিবাদ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর রাজনীতিকে বিতর্কিত করে রেখেছে।
Leave a comment