ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা বা ক্ষমতাচ্যুত করার ইঙ্গিতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, খামেনির ওপর যে কোনো ধরনের হামলা বা ষড়যন্ত্রকে ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের বক্তব্য ঘিরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা নতুন করে বেড়েছে।
এর আগে রোববার (১৮ জানুয়ারি) মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “ইরানের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার সময় এসেছে।” বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে হত্যা বা ক্ষমতাচ্যুত করার ইঙ্গিত দেন। তার এই বক্তব্য প্রকাশের পরপরই কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে লেখেন,“আমাদের মহান নেতার ওপর যে কোনো ধরনের হামলা ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।”
তিনি আরও বলেন, ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও নেতৃত্বের নিরাপত্তা রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
পেজেশকিয়ান একই পোস্টে ইরানের চলমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেন। তার ভাষায়,“ইরানিদের জীবনে যে আর্থিক কষ্ট ও দুরবস্থা দেখা যাচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্কিন সরকার ও তাদের মিত্রদের শত্রুতাপূর্ণ নীতি এবং অমানবিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা।”
এদিকে পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প খামেনির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা “অসুস্থ মানসিকতার” এবং তার উচিত দেশ পরিচালনার পদ্ধতি পরিবর্তন করা। ট্রাম্পের এই বক্তব্য ইরানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে এবং সরকারি ও আধা-সরকারি গণমাধ্যমে বিষয়টি কঠোরভাবে নিন্দা করা হচ্ছে।
এই উত্তেজনার পটভূমিতে ইরানের সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশটিতে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ শুরু হয়। জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখে সেই বিক্ষোভ সহিংস রূপ ধারণ করে। আন্দোলনকারীদের একাংশ সরকারের পদত্যাগের পাশাপাশি সর্বোচ্চ নেতার বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন।
এই বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রকাশ্য সমর্থনের অভিযোগ তুলে আসছে তেহরান। মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানের জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং তেহরানের ওপর চাপ আরও বাড়ানোর হুমকি দেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ বিক্ষোভে সম্পৃক্ততার বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য করায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর অবস্থানে গিয়ে বিক্ষোভ দমন করে। ইরানের সরকারি সূত্রগুলো দাবি করেছে, ওই সহিংসতায় হাজারো বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে এবং স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এসব প্রাণহানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যকে উসকানিমূলক বলে দায়ী করেছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খামেনিকে লক্ষ্য করে দেওয়া মন্তব্য ও তার জবাবে ইরানের এই কঠোর অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে গাজা যুদ্ধ, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকট এবং পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে।
Leave a comment