Home আঞ্চলিক ক্রোক হচ্ছে মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ, আতঙ্কে গোদাগাড়ীর হেরোইন সিন্ডিকেট
আঞ্চলিক

ক্রোক হচ্ছে মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ, আতঙ্কে গোদাগাড়ীর হেরোইন সিন্ডিকেট

Share
Share

মো. গোলাম কিবরিয়া, রাজশাহী 


রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত অবৈধ সম্পদ নিয়ে আতঙ্কে পড়েছেন শীর্ষ হেরোইন কারবারিরা। আদালতের নির্দেশে ইতোমধ্যে দুই মাদক কারবারির সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। আরও ২০ জনের সম্পদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার তালিকাভুক্ত ১৮৪ জন হেরোইন কারবারিকে তদন্তের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

সম্প্রতি কারাগারে থাকা গোদাগাড়ীর শীর্ষ মাদক কারবারি তারেক হোসেনের সম্পদ ক্রোকের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেটগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, অনেকেই এখন অবৈধ সম্পদ গোপন বা অন্যের নামে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে মাদক কারবারিদের সম্পদ ক্রোকের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের শেষ দিক থেকে তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু হয়। যাঁদের বৈধ আয়ের উৎস নেই, অথচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী আদালতে আবেদন করা হচ্ছে। আদালতের আদেশের পর সংশ্লিষ্ট সম্পদ ক্রোক করা হচ্ছে, যাতে তা বিক্রি, হস্তান্তর বা গোপন করা না যায়।

রাজশাহীর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত গত ৬ এপ্রিল মো. আব্দুল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী সায়েরা বেগমের অবৈধ সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, আব্দুল্লাহর নামে ছয়টি দলিলে থাকা ১৯৯ দশমিক ২১ শতাংশ এবং সায়েরা বেগমের নামে পাঁচটি দলিলে থাকা ১৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ জমি ক্রোক করা হয়।

এরপর ২৩ মে একই আদালত শীর্ষ মাদক কারবারি তারেক হোসেনের নামে চারটি দলিলে থাকা ১৯৯ দশমিক ১১৭৫ শতাংশ জমি ক্রোকের আদেশ দেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানায়, আব্দুল্লাহ ও সায়েরা দম্পতির বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার সহড়াগাছি গ্রামে। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তাঁরা এই সম্পদ অর্জন করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক আলী আসলাম হোসেন তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন। আদালতের আদেশের পর ক্রোক করা সম্পত্তিতে সরকারি নোটিশসংবলিত ব্যানার টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, তারেক হোসেনের বাড়ি গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদারপুর মহল্লায়। স্থানীয়দের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারত থেকে হেরোইন এনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতেন। গত বছরের ২২ এপ্রিল সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল তাঁর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে হেরোইন বিক্রির ১৩ লাখ টাকাসহ তাঁকে আটক করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উপজেলার তিরিন্দা-ভাজনপুর এলাকায় তাঁর গরুর খামারে অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ৬ কেজি হেরোইন উদ্ধার করা হয়।

এর পর থেকেই তারেক হোসেন রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান। ওই মামলায় আদালত তাঁর ২৭ লাখ ৬১ হাজার টাকা মূল্যের জমি ক্রোকের আদেশ দেন।

গোদাগাড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামসুল ইসলাম বলেন, ‘ক্রোকাদেশ বহাল থাকা অবস্থায় এই সম্পত্তি কোনোভাবেই বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। আদালতের আদেশ আমরা পেয়েছি এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।’

গোদাগাড়ী নাগরিক স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি আইনজীবী সালাহউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘মাদক কারবারিদের অবৈধ সম্পদ ক্রোকের উদ্যোগ ইতিবাচক। এটি আরও আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল। এখন অনেকেই সম্পদ অন্যের নামে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। সেটিও যেন রোধ করা যায়, সে বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গোদাগাড়ী পৌরসভার সাগরপাড়া মহল্লার আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি আবুল কালাম আজাদের অবৈধ সম্পদের বিষয়েও তদন্ত চলছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রতি মাসে প্রায় এক মণ হেরোইন দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করেন। তাঁর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সাতটি মাদক মামলা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি প্রায় ২০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। সম্প্রতি এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ার পর থেকে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে রয়েছেন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, ‘মাদক ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করতে আমরা অবৈধ সম্পদ ক্রোকের উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে দুজনের সম্পদ ক্রোক হয়েছে। আরও ২০ জনের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এ জন্য ২০ থেকে ২২টি সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাঁদের বৈধ আয়ের উৎস নেই, কিন্তু বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে গোদাগাড়ীর ১৮৪ জন শীর্ষ মাদক কারবারির তালিকা রয়েছে। এরা মূলত হেরোইন সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। পর্যায়ক্রমে তাঁদের প্রত্যেককে তদন্তের আওতায় আনা হবে।’

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

গঙ্গায় মর্মান্তিক নৌকাডুবি: শিশুসহ ১৩ জনের প্রাণহানি

ভারতের বিহার রাজ্যের বৈশালী জেলায় গঙ্গানদীতে একটি যাত্রীবাহী নৌকাডুবির অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত মঙ্গলবার সংঘটিত এই দুর্ঘটনায়...

ডোপ টেস্টে পজিটিভ, কিশোরগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল বরখাস্ত

  মাদকাসক্তি পরীক্ষায় (ডোপ টেস্ট) পজিটিভ ফল আসায় কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের এক কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি...

Related Articles

রহনপুরে মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের দাবিতে জনসভা

  চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরের কেডিসিপাড়ায় মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধ এবং...

সিলেটে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহ শুরু আজ থেকে

সিলেট নগরে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার (১৩...

স্ত্রীর নিথর দেহ রেখে মসজিদে আজান দিলেন স্বামী, নামাজ শেষে প্রাণ হারালেন তিনিও

ঘরে পড়ে রয়েছে চিরবিদায় নেওয়া অর্ধাঙ্গিনীর নিথর দেহ। সেই গভীর শোক বুকে...

মুরাদনগরে কন্যাশিশু দিবস উদযাপন, বাল্যবিবাহ বন্ধে সচেতনতার আহ্বান

  ‘শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে কুমিল্লার মুরাদনগরে...

;