কলম্বিয়ার উত্তরাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এক মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় অন্তত ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা সাতেনা (SATENA) পরিচালিত একটি যাত্রীবাহী বিমান ভেনেজুয়েলা সীমান্তের কাছে বিধ্বস্ত হলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, বিমানে থাকা ১৩ জন যাত্রী ও দুইজন ক্রু—মোট ১৫ জনের কেউই বেঁচে নেই।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটি ছিল বিচক্রাফ্ট ১৯০০ (Beechcraft 1900) মডেলের টুইন-প্রপেলার বিমান, যা সাধারণত স্বল্প দূরত্বের অভ্যন্তরীণ রুটে ব্যবহৃত হয়। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) স্থানীয় সময় সকালে ফ্লাইট এনএসই ৮৮৪৯ কলম্বিয়ার সীমান্তবর্তী শহর কুকুতা থেকে ওকানিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে বিমানটির গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা থাকলেও অবতরণের প্রায় ১১ মিনিট আগে হঠাৎ করেই এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিমান সংস্থার এক বিবৃতিতে জানানো হয়, যোগাযোগ হারানোর পরপরই জরুরি অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়। পরে সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী দল সম্ভাব্য রুট এবং রাডার তথ্য বিশ্লেষণ করে পাহাড়ি একটি দুর্গম এলাকায় ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিমানটি প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশ ও আবহাওয়াজনিত কারণে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে থাকতে পারে, তবে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো কারণ জানানো হয়নি।
সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, নিহতদের মধ্যে কলম্বিয়ার বর্তমান আইনপ্রণেতা ডায়োজেনেস কুইন্তেরো আমায়া এবং আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের প্রার্থী কার্লোস সালসেদো রয়েছেন। তাঁদের মৃত্যুতে রাজনৈতিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারি প্রতিনিধিরা শোকবার্তা জানিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
দুর্ঘটনাস্থলটি অত্যন্ত দুর্গম এবং ঘন পাহাড়ি বনাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কলম্বিয়ার সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, খাড়া ঢাল, সীমিত প্রবেশপথ এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আবহাওয়া পরিস্থিতি উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হেলিকপ্টার ব্যবহার করে উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা চালালেও দৃশ্যমানতা ও বাতাসের গতি মাঝে মাঝে অভিযান ব্যাহত করছে।
নিরাপত্তাজনিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্ঘটনাস্থল সংলগ্ন এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (ELN)-এর প্রভাবাধীন হিসেবে পরিচিত। যদিও এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনার সঙ্গে কোনো নাশকতার যোগসূত্র পাওয়া যায়নি, তবুও উদ্ধার ও তদন্ত কার্যক্রমে নিরাপত্তা বাহিনী বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ফ্লাইট ডেটা, আবহাওয়ার অবস্থা, বিমানের যান্ত্রিক রেকর্ড এবং পাইলটদের অভিজ্ঞতা—সব দিক পর্যালোচনা করবে। এ ছাড়া বিমানের ব্ল্যাক বক্স (যদি উদ্ধারযোগ্য থাকে) বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, Beechcraft 1900 মডেলের বিমান সাধারণত পাহাড়ি ও স্বল্প রানওয়ে বিশিষ্ট অঞ্চলে চলাচলের জন্য উপযোগী । তবে পার্বত্য এলাকায় উড্ডয়ন সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন, নিম্ন মেঘস্তর বা নেভিগেশনাল সীমাবদ্ধতা থাকলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু কলম্বিয়া নয়, গোটা লাতিন আমেরিকাজুড়ে বিমান নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের ফলাফলের দিকে, যা হয়তো ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Leave a comment