রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, প্রতিটি মলোটভ ককটেল বা হাতবোমা বিস্ফোরণের পর এর ভিডিও পাঠালে সংশ্লিষ্টদের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে খোলা বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে আসছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের দাবি, ভারতে অবস্থানরত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতা এসব নাশকতার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মাঠপর্যায়ে ককটেল বিস্ফোরণের কাজে মাদকাসক্ত ও ভাসমান ব্যক্তিদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি দলীয় পদ-পদবির প্রলোভন দেখিয়ে তরুণদেরও এতে যুক্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় ককটেল তৈরির কথিত গোপন কারখানার সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় ডিবি একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বংশাল থানা ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক রায়হান উদ্দিনসহ ছাত্রলীগের কর্মী রাসেল খান, আলা উদ্দিন ও আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ দনিয়া কাঁচাবাজার এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০টি হাতবোমা উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় শাহজাহানপুর থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও যুবলীগের কর্মী মোহাম্মদ সানমুনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফকে মোটরসাইকেল ও ককটেলসহ গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে ডিবি।
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান জানিয়েছেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নির্দেশে তাঁরা যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তাঁরা পরিচিত এক দোকানদারের মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। বিস্ফোরণের পর ভিডিও করে নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠানো হলে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে টাকা দেওয়া হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবি ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন এবং ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশল ব্যবহার করছেন।
তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, কোনো হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টে ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করা হলেই ব্যবহারকারী ভারতে অবস্থান করছেন—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। রোমিং সুবিধা বা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে ওই অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা সম্ভব।
এদিকে নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার সন্দেহে গত সোমবার রাতে ঢাকার উত্তরা থেকে রবিউল ইসলাম নামের এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির রমনা জোনাল টিম। পুলিশ জানায়, তাঁর পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। তাঁকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বাসে অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজির সমন্বয়ের অভিযোগে কক্সবাজার থেকে ডেমরা থানা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সবুজকে গ্রেপ্তার করেছে ডেমরা থানা-পুলিশ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার থাকায় নাশকতায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে। নাশকতার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Leave a comment