ইরানের নতুন ‘সুপ্রিম লিডার’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মোজতবা খামেনি। তিনি ইরানের সাবেক সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দ্বিতীয় সন্তান। দেশটির প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিষদ ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ ভোটাভুটির মাধ্যমে তাকে দেশের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করেছে।
রোববার (৮ মার্চ) বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত প্রায় সোয়া ৩টার দিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। সেখানে জানানো হয়, ৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টের বৈঠকে ভোটের মাধ্যমে নতুন সুপ্রিম লিডার নির্বাচন করা হয় এবং তাতে মোজতবা খামেনি সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পান।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী সুপ্রিম লিডারই দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালী ব্যক্তি। তিনি রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর চূড়ান্ত ক্ষমতা রাখেন। তাই নতুন সুপ্রিম লিডার নির্বাচন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রসঙ্গত, অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট হলো ইরানের একটি শক্তিশালী ধর্মীয় পরিষদ, যার সদস্যসংখ্যা ৮৮। এই পরিষদের সদস্যরা মূলত উচ্চপর্যায়ের শিয়া আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। সংবিধান অনুযায়ী তারাই দেশের সুপ্রিম লিডার নির্বাচন এবং প্রয়োজনে তাকে অপসারণ করার ক্ষমতা রাখেন।
সর্বশেষ বৈঠকে পরিষদের সদস্যরা ভোটাভুটির মাধ্যমে মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচন করেন। নির্বাচন শেষে পরিষদের পক্ষ থেকে জনগণ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি নতুন সুপ্রিম লিডারের প্রতি সমর্থন ও আনুগত্য প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি এতদিন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন না। তিনি কখনো জাতীয় কোনো নির্বাচনে অংশও নেননি। তবে তার বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দীর্ঘ সময় ধরে সুপ্রিম লিডার থাকাকালে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মোজতবার প্রভাব নিয়ে বহু আলোচনা ছিল।
বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে এই সম্পর্কই তাকে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে সম্ভাব্য প্রার্থী করে তুলেছিল।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গত কয়েক বছর ধরে ইরানের রাজনৈতিক মহলে মোজতবা খামেনির নাম সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ঘুরে ফিরে এসেছে। তবে তিনি নিজে কখনো প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করেননি বা নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেননি।
মোজতবা খামেনির সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক মন্তব্যে বলেন, মোজতবা খামেনি যদি ইরানের সুপ্রিম লিডার হন, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি আরও বলেন, ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
তবে ইরানের ধর্মীয় পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট এই মন্তব্যকে গুরুত্ব না দিয়েই নিজেদের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নতুন সুপ্রিম লিডার ঘোষণা করেছে।
নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে মোজতবা খামেনির সামনে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক—সব মিলিয়ে তার নেতৃত্বের প্রথম সময়টাই হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়া দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করাও তার জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সুপ্রিম লিডারের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় মোজতবা খামেনির সিদ্ধান্ত আগামী বছরগুলোতে দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা।
Leave a comment