ভারি তুষারপাত ও বরফাচ্ছন্ন শীতকালীন ঝড় ইউরোপজুড়ে জনজীবনে চরম বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। একাধিক দেশে প্রাণহানি, ব্যাপক পরিবহন ব্যাঘাত এবং হাজারো যাত্রীর দুর্ভোগের খবর পাওয়া গেছে। সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, এই দুর্যোগে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আবহাওয়া সংস্থাগুলো।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ফ্রান্সে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তুষারপাতের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় লঁদ এলাকায় বরফে পিচ্ছিল সড়কে দুটি পৃথক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তিনজন।
এছাড়া প্যারিস অঞ্চলে আরও দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন দুজন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পূর্ব প্যারিসে একটি ভারী পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়। অন্য ঘটনায়, এক ট্যাক্সিচালক তুষারের কারণে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতে ধাক্কা দেন। পরে গাড়িটি মার্ন নদীতে পড়ে গেলে একজন নিহত হন।
বলকান অঞ্চলেও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজধানী সারায়েভোতে ভেজা ও ভারী তুষারের চাপে একটি বড় গাছ ভেঙে পড়ে এক নারী নিহত হন। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, তীব্র শীত ও ভারী বৃষ্টির সঙ্গে তুষারপাত মিলিত হয়ে ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই তুষারঝড়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ইউরোপের আকাশপথে। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসসহ একাধিক দেশের বিমানবন্দরগুলোতে শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ফ্রান্সের প্রধান বিমানবন্দর রুয়াসি–শার্ল দ্য গল-এ রানওয়ে পরিষ্কারের জন্য বুধবার সকালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সময়ে অরলি বিমানবন্দরও তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ফ্লাইট বাতিলের পরিকল্পনা করে। এর ফলে প্যারিসে হাজারো যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়েন।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের স্কিপহোল বিমানবন্দরেও পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত জটিল। বুধবার সেখানে ৪০০টির বেশি ফ্লাইট বাতিল করা হয়। পরবর্তী সময়ে ডাচ সম্প্রচারমাধ্যম জানায়, উড্ডয়নের জন্য নির্ধারিত আরও প্রায় ৬০০টি ফ্লাইট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডাচ জাতীয় বিমান সংস্থা কেএলএম জানায়, চরম আবহাওয়া ও সরবরাহ জটিলতার কারণে তাদের বিমানের বরফ গলানোর তরল দ্রুত ফুরিয়ে গেছে, যা ফ্লাইট বাতিলের অন্যতম কারণ। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সার্বক্ষণিক তুষার পরিষ্কার ও ডি-আইসিং কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
স্কিপহোল বিমানবন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী। আমস্টারডাম থেকে নরওয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা স্পেনের নাগরিক হাভিয়ের সেপুলভেদা বলেন, বিমানবন্দরের অবস্থা ছিল “অরাজক, হতাশাজনক এবং সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য।” তিনি জানান, কেএলএম-এর সহায়তা ডেস্কে ছয় ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কোনো অগ্রগতি হয়নি।
স্থলপথেও বিপর্যয় কম ছিল না। তীব্র তুষারপাত ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে নেদারল্যান্ডসে মঙ্গলবার সকালে সাময়িকভাবে সব ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ৯টার পর কিছু ট্রেন চলাচল শুরু হলেও সারাদিন যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটে। আমস্টারডাম থেকে প্যারিসগামী ইউরোস্টার ট্রেনগুলোর অনেকগুলো বাতিল করা হয়, বাকিগুলো চলে দীর্ঘ বিলম্বে। এতে আন্তর্জাতিক যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
ফ্রান্সের পরিবহণমন্ত্রী ফিলিপ তাবারো জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত ও বুধবার দেশটির বিভিন্ন এলাকায় আরও তুষারপাতের আশঙ্কা রয়েছে। তিনি জনগণকে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে এবং সম্ভব হলে বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, বুধবার তুষারপাত ও কালো বরফের ঝুঁকিতে দেশটির অন্তত ৩৮টি জেলায় বিশেষ সতর্কতা জারি থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শীতকালীন ঝড় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও তীব্র হয়ে উঠছে। আকস্মিক তুষারপাত ও বরফাচ্ছন্ন সড়ক ইউরোপের পরিবহন ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের সতর্ক থাকতে, আবহাওয়া সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে চলতে এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ না করার অনুরোধ জানিয়েছে। ইউরোপজুড়ে শীতের এই তীব্র দাপট জনজীবনে যে কতটা গভীর প্রভাব ফেলছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তারই স্পষ্ট উদাহরণ।
Leave a comment