Home আন্তর্জাতিক আবারও সিরিয়ায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
আন্তর্জাতিক

আবারও সিরিয়ায় ব্যাপক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

Share
Share

সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট (আইএস)–এর বিরুদ্ধে আবারও বড় পরিসরের সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মাসে মধ্য সিরিয়ার ঐতিহাসিক শহর পালমিরায় এক অতর্কিত হামলায় দুই মার্কিন সেনা ও এক বেসামরিক দোভাষী নিহত হওয়ার পর ওয়াশিংটন এই নতুন দফার আক্রমণ শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই অভিযান শুধু প্রতিশোধ নয়, বরং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি একটি কড়া বার্তা—মার্কিন বাহিনীর ওপর আঘাত এলে পৃথিবীর যে প্রান্তেই হোক, হামলাকারীদের খুঁজে বের করে জবাব দেওয়া হবে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) শনিবার এক বিবৃতিতে জানায়, গ্রিনিচ মান সময় বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আইএসের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এতে বিমান ও ড্রোনের মাধ্যমে গ্রামীণ ও মরুভূমি অধ্যুষিত অঞ্চলে আইএসের ঘাঁটি, রসদকেন্দ্র ও চলাচলের পথ লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয় ।

সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়, “আমাদের বার্তা পরিষ্কার—আমাদের যোদ্ধাদের ক্ষতি করলে আমরা আপনাদের খুঁজে বের করব এবং বিশ্বের যেখানেই থাকুন না কেন, আপনাদের হত্যা করা হবে। ন্যায়বিচার এড়াতে যতই চেষ্টা করুন, লাভ হবে না।”
এই ভাষা থেকে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এই অভিযানের মাধ্যমে শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও কঠোর অবস্থান জানাতে চায়।

হামলায় হতাহতের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি। তবে সেন্টকম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত ঝাপসা আকাশচিত্রে দেখা যায়, সিরিয়ার গ্রামীণ এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণ ঘটছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই অভিযান অংশীদার বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হয়েছে, যদিও কোন কোন বাহিনী এতে অংশ নিয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পালমিরায় মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র যে ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন হকআই স্ট্রাইক’। গত ১৩ ডিসেম্বর পালমিরায় এক বন্দুকধারীর হামলায় দুই মার্কিন সেনা ও এক বেসামরিক দোভাষী নিহত হন। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, ওই হামলাকারী দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীরই একজন সদস্য ছিলেন, যিনি চরমপন্থি মতাদর্শে জড়িয়ে পড়ায় বরখাস্তের মুখে ছিলেন।

এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত পাল্টা অভিযান শুরু করে। গত ১৯ ডিসেম্বর প্রথম দফায় মধ্য সিরিয়ায় আইএসের অবকাঠামো, অস্ত্রভাণ্ডার ও ঘাঁটি লক্ষ্য করে ৭০টিরও বেশি স্থানে বিমান ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। এরপর ৩০ ডিসেম্বর ওয়াশিংটন জানায়, অপারেশন হকআই স্ট্রাইকের আওতায় অন্তত ২৫ জন আইএস যোদ্ধাকে হত্যা বা আটক করা হয়েছে।

নতুন এই দফার হামলা সেই অভিযানেরই সম্প্রসারণ, যার লক্ষ্য আইএসকে পুনর্গঠনের সুযোগ না দেওয়া এবং সংগঠনটির নেতৃত্ব ও রসদব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা।

সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে আইএসবিরোধী লড়াইয়ে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) ছিল ওয়াশিংটনের প্রধান মিত্র। তবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।

আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ায় নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে দামেস্কের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় বাড়াচ্ছে। গত বছরের শেষ দিকে এক সমঝোতার মাধ্যমে সিরিয়া আইএসবিরোধী বৈশ্বিক জোটে যোগ দেয়। সেই সময় সিরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা হোয়াইট হাউস সফর করেন—যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়।

সিরীয় কর্মকর্তারা গত মাসে আরও দাবি করেন, আইএসের শীর্ষ নেতা তাহা আল-জুবিকে দামেস্কের উপকণ্ঠ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবু এটি আইএসের ওপর বাড়তে থাকা চাপের ইঙ্গিত দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছেন। তার প্রথম মেয়াদে তিনি সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও শেষ পর্যন্ত তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে সিরিয়ায় প্রায় এক হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে, যাদের মূল দায়িত্ব আইএসবিরোধী অভিযান ও স্থানীয় অংশীদার বাহিনীকে সহায়তা করা।

মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে সিরিয়ায় সেনা সংখ্যা কমানো হবে এবং দেশটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা কমিয়ে একটিতে নিয়ে আসা হবে। তবে পালমিরার হামলা ও তার জবাবে নতুন করে বিমান ও ড্রোন হামলা দেখাচ্ছে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে প্রস্তুত।

বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ায় এই নতুন দফার হামলা শুধু আইএসকে লক্ষ্য করেই নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধমূলক কৌশলের অংশ। ইরাক, সিরিয়া ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো আইএসের বিচ্ছিন্ন সেলগুলো সক্রিয় রয়েছে, যারা সুযোগ পেলেই বড় হামলার চেষ্টা করছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

অটোরিকশা চালক হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন

ভোলার লালমোহন উপজেলায় অটোরিকশা চালককে কুপিয়ে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ...

মানিকগঞ্জে হেরোইনসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় হেরোইনসহ দুই মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাতে...

Related Articles

নিখুঁত সৌন্দর্যের নেশায় ৩৮৮ বার প্লাস্টিক সার্জারি করলেন যে নারী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁর ছবি দেখলে অনেকেই বিভ্রান্ত হন—তিনি মানুষ না কি কোনো...

ইরানে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করলো আইআরজিসি, দেশজুড়ে উত্তেজনা চরমে

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ্যে ‘রেড লাইন’ ঘোষণা করেছে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড...

মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশি শিশু নিহত

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গ্রুপ, আরাকান আর্মি ও...

ইরানে বিক্ষোভকারীদের ‘আল্লাহর শত্রু’ ঘোষণা: মৃত্যুদণ্ডের হুমকি

ইরানে টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা গণবিক্ষোভের মধ্যে দেশটির সরকার এবার আরও...