Home সাম্প্রতিক অ্যাটেনবরো: ঝুঁকি নিয়ে বদলে দিলেন পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি
সাম্প্রতিক

অ্যাটেনবরো: ঝুঁকি নিয়ে বদলে দিলেন পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি

Share
Share


৮ মে ২০২৬

স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো—বর্তমানে যার বয়স ১০০ বছর—আজ বিশ্বের কাছে প্রকৃতির এক শান্ত, নির্ভরযোগ্য ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। তবে তাঁর সাত দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায় এক দুঃসাহসী সম্প্রচারককে, যিনি বারবার ঝুঁকি নিয়েছেন, নতুন প্রযুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং পৃথিবীর দুর্গম ও বিপজ্জনক অঞ্চলে অভিযান চালিয়েছেন।

রঙিন টেলিভিশনের সূচনা থেকে শুরু করে ৮৯ বছর বয়সে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে রেকর্ড গড়া ডাইভিং—সবকিছুর মধ্যেই ছিল পৃথিবী ও এর জীববৈচিত্র্যকে নতুনভাবে দেখার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা।

বিরল ফুটেজ ও ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের মাধ্যমে আজ আমরা ফিরে দেখি সেই পথচলা, যা বদলে দিয়েছে প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।

ঘরে এল বন্যপ্রাণী

তরুণ ডেভিড অ্যাটেনবরো প্রথমে শিশুদের বিজ্ঞানবিষয়ক বই সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি রেডিওতে চাকরির আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বিবিসির টেলিভিশন সার্ভিসে কাজের প্রস্তাব পান। পারিবারিক দ্বিধা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি ‘প্রডিউসার’ হিসেবে যোগ দেন।

সেই সময় টেলিভিশনের বেশিরভাগ অনুষ্ঠানই ছিল সরাসরি সম্প্রচারভিত্তিক। অ্যাটেনবরো নিয়ে এলেন যুগান্তকারী ধারণা—Zoo Quest। এটিই ছিল প্রথম টেলিভিশন সিরিজ, যেখানে স্টুডিও উপস্থাপনার সঙ্গে লোকেশনে ধারণ করা বন্যপ্রাণীর ফুটেজ যুক্ত করা হয়।

বিরল প্রাণীর সন্ধানে তিনি নিজেই অভিযানে অংশ নিতেন। ১৯৫৬ সালে তাঁর দল প্রথমবারের মতো বিরল পাখি ‘হোয়াইট-নেকড রকফাউল’ এবং বিশালাকার সরীসৃপ ‘কোমোডো ড্রাগন’-এর চিত্র ধারণ করে।

রঙের বিপ্লব

১৯৫২ সালে বিবিসিতে যোগ দেওয়ার সময় অ্যাটেনবরোর নিজের বাড়িতেই কোনো টেলিভিশন সেট ছিল না। কিন্তু মাত্র ১৫ বছরের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন বিবিসি টু-এর কন্ট্রোলার। তাঁর হাত ধরেই ইউরোপে শুরু হয় রঙিন টেলিভিশনের যুগ।

তিনি চেয়েছিলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে ব্রিটেন যেন অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। সেই লক্ষ্য থেকেই ১৯৬৯ সালে নির্মিত হয় যুগান্তকারী সিরিজ Civilisation। পরবর্তীতে বিজ্ঞানের ইতিহাসভিত্তিক The Ascent of Man নির্মাণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

উচ্চ বাজেট ও আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণশৈলীর কারণে এসব প্রামাণ্যচিত্র বিশ্বব্যাপী টেলিভিশন ডকুমেন্টারির নতুন মানদণ্ড তৈরি করে।

ক্যামেরার সামনে ফেরা

প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে অ্যাটেনবরো আবার ফিরে আসেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় জায়গায়—ক্যামেরার সামনে। ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায় তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প Life on Earth।

এটি ছিল প্রকৃতি বিষয়ক প্রথম ডকুমেন্টারি সিরিজ, যার নির্মাণ ব্যয় এক মিলিয়ন পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বের শতাধিক স্থানে ধারণ করা এই সিরিজে দেখানো হয়, কীভাবে বিবর্তনের ধারায় পৃথিবীর প্রাণীকুল গড়ে উঠেছে।

এই সিরিজের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি ছিল রুয়ান্ডার পাহাড়ি গরিলাদের সঙ্গে অ্যাটেনবরোর অন্তরঙ্গ দৃশ্য, যা আজও টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম সেরা মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

নতুন প্রজন্মের জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার

অ্যাটেনবরো সবসময়ই বিশ্বাস করতেন, প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে আরও কাছ থেকে তুলে ধরা সম্ভব।

The Blue Planet (২০০১) প্রথমবারের মতো সমুদ্রের গভীরের অজানা প্রাণীদের ফুটেজ বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসে।

এরপর Planet Earth (২০০৬)-এ ব্যবহার করা হয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হেলিকপ্টার ক্যামেরা, যার মাধ্যমে বন্যপ্রাণীদের বিরক্ত না করেই দূর থেকে তাদের শিকার ও অভিবাসনের দৃশ্য ধারণ করা সম্ভব হয়।

অ্যাটেনবরো বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট, রঙিন, এইচডি, থ্রি-ডি এবং ফোর-কে—সব ফরম্যাটেই বাফটা পুরস্কার অর্জন করেছেন। ৮৯ বছর বয়সে তিনি গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে ডুব দিয়ে রেকর্ডও গড়েন।

প্রকৃতির পক্ষে উচ্চকণ্ঠ

দীর্ঘদিন বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করলেও, ২০০০ সালের পর থেকে অ্যাটেনবরো সরাসরি পরিবেশ ধ্বংস ও জলবায়ু সংকট নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন।

২০০৬ সালে তিনি স্বীকার করেন, একসময় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে তাঁর কিছুটা সংশয় ছিল। তবে পরবর্তীতে তিনি নিশ্চিত হন যে এটি মানবজাতির সামনে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংকট।

৯৩ বছর বয়সে তিনি Glastonbury Festival-এ প্রায় এক লাখ মানুষের সামনে বক্তব্য দেন—যা তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে আছে।

ছোট্ট ওটিসের চিঠি

একবার চার বছরের শিশু ওটিস স্যার ডেভিডকে চিঠি লিখে প্রশ্ন করেছিল, “মানুষ কি ডাইনোসরদের মতো একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে?”

জবাবে অ্যাটেনবরো লিখেছিলেন—

“প্রিয় ওটিস, মানুষ বিলুপ্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা আমাদের গ্রহের সঠিক যত্ন নিচ্ছি।”

এই এক বাক্যেই যেন ফুটে ওঠে তাঁর সারাজীবনের দর্শন।

আজ অ্যাটেনবরোর প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। ব্যাঙ, বিটল থেকে শুরু করে ডাইনোসরের জীবাশ্ম—অন্তত ৫০টিরও বেশি প্রজাতির নামকরণ করা হয়েছে তাঁর নামে। তিনি শুধু একজন নির্মাতা নন; তিনি পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের এক অবিচল রক্ষক এবং মানবজাতির কাছে প্রকৃতির সবচেয়ে বিশ্বস্ত গল্পকার।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

নওগাঁয় ২৪৫ কেজির কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ জব্দ, আটক ১

নওগাঁয় পাচারের উদ্দেশ্যে রাখা ২৪৫ কেজি ওজনের একটি কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গ জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ ঘটনায় মোস্তফা আলী (৩৪) নামের এক...

‘১৭ বছর লন্ডনে থাকায় তারেক রহমান বাংলাদেশের মানুষের ভাষা বুঝতে পারছেন না’

রাহাদুল ইসলাম সুজন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থান করায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের মানুষকে চিনতে পারছেন না, এমনকি...

Related Articles

হেরে গিয়ে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার অভিযোগ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে

ইসরায়েলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে কাতার ও তুরস্কের মতো বিদেশি শক্তির...

শতবর্ষী উসমানপুর গায়েবি মসজিদের মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করে নতুন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার উসমানপুর গ্রামের শতবর্ষী ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘উসমানপুর গায়েবি মসজিদ’-এর মূল...

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলা: খলনায়ক ডনের জামিন আবেদন নামঞ্জুর

অমর চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ হত্যা মামলায় ঢাকাই...

সোনারগাঁয়ে স্লিপার বাসের সিটে মিলল ২৩ হাজার ইয়াবা, গ্রেপ্তার ৩

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি বিলাসবহুল স্লিপার বাসের সিটের ভেতরে বিশেষ...

;