Home Uncategorized অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সত্যতার প্রমাণ পাওয়ার অভিযোগ
Uncategorizedঅপরাধ

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সত্যতার প্রমাণ পাওয়ার অভিযোগ

Share
Share

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই একের পর এক লিখিত অভিযোগ জমা পড়তে শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগগুলোতে শুধু উপদেষ্টাদেরই নয়, তাদের সুপারিশে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর তথ্য উঠে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দুদক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা সময়টাতে যে নৈতিকতা ও জবাবদিহির প্রত্যাশা জনগণ করেছিল, বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র সামনে আসছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। বিশেষ করে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ছিল স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু এখন নানা অভিযোগের কারণে সেই প্রত্যাশা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতায় থাকার সময় প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, অস্বচ্ছ নিয়োগ এবং আর্থিক সুবিধা নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) মানি লন্ডারিং ও সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অন্তত চারজন সাবেক উপদেষ্টা ও একজন বিশেষ সহকারীর ব্যাংক হিসাব তলব করেছে। যাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আসিফ মাহমুদ, আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) খোদা বখস চৌধুরী। সংস্থাটি দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সংশ্লিষ্টদের ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের বিবরণ এবং সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রমের তথ্য চেয়েছে। তদন্তকারীরা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখছেন, দায়িত্বে থাকার সময় তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক বা বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে কি না।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে ব্যয় বৃদ্ধি, অযৌক্তিক প্রকল্প গ্রহণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন প্রকল্পের অনুমোদন ও বাজেট বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ প্রভাব খাটিয়েছেন।
তার একান্ত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের চাপ বাড়তে থাকায় দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই তাকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন আসিফ মাহমুদ। বর্তমানে এই এপিএসের আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের উৎস নিয়েও তদন্ত করছে দুদক।
এছাড়া আলোচনায় এসেছে মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়িচালকের ভাইয়ের আয়কর সংক্রান্ত তথ্যও। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে তিনি প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার আয় দেখিয়েছেন, যা তার পেশা ও আয় উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ফলে এই আয় উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।
দুর্নীতির অভিযোগের তালিকায় এসেছে ঢাকার একটি সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক এজাজের নামও। জানা গেছে, তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সুপারিশ করেছিলেন। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে তহবিল তছরুফসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেক ছাত্র উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তার সাবেক একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে নিজের স্ত্রীর মাধ্যমে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করেছেন এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, এসব অনিয়মের মাধ্যমে শত কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করার পর একই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আরেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধেও নতুন অভিযোগ জমা পড়েছে দুদকে। অভিযোগ রয়েছে, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
শুধু উপদেষ্টারাই নন, অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধেও আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধেও নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলো বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বে থাকা সময়েই দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছিলেন সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার। তিনি গত বছরের আগস্টে দাবি করেছিলেন, অন্তত আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। তবে সে সময় অন্তর্বর্তী সরকার তার অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখন দায়িত্ব ছাড়ার পর যখন একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ছে, তখন সেই অভিযোগগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেছেন, কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, “যদি প্রাথমিকভাবে দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায় এবং তা আমলযোগ্য হয়, তাহলে অবশ্যই তদন্ত করতে হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।”
বিশ্লেষকদের মতে, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ তদন্ত দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ যদি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে দুদক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। তবেই জনগণের প্রত্যাশিত জবাবদিহি ও সুশাসনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

সিলেটের বিএনপিকে নাহিদ ইসলেমের বিশেষ বার্তা

সিলেট প্রতিনিধি  | জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সিলেট সব সময় ঐক্যের রাজনীতির উদাহরণ তৈরি করেছে। আমরা...

নিকার-এর সভাপতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সদস্য হলেন সিলেটের খন্দকার মুক্তাদির

স্টাফ রিপোর্টার । প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সভাপতি করে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি’ (নিকার) পুনর্গঠন করেছে সরকার। ২০ সদস্যের এই শক্তিশালী কমিটিতে...

Related Articles

দেশের সবচেয়ে কম ব্যাংক ঋণ সিলেটে, শীর্ষে ঢাকা বিভাগ

দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিতরণ করা ঋণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম ঋণ রয়েছে...

ইবির সেই শিক্ষিকার মরদেহে ২০টি আঘাতের চিহ্ন, এজাহারে উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিজ দপ্তরে হামলার শিকার হয়ে নিহত সমাজকল্যাণ বিভাগের...

জকিগঞ্জে রাস্তার ইট লুটের অভিযোগে যুব জামায়াত নেতা আটক

সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় সরকারি সড়কের ইট লুটপাটের অভিযোগে উপজেলা যুব জামায়াতের এক...

রাতের আধারে অবৈধ বালু উত্তোলন ঘিরে সংঘর্ষ, আহত ১০

  মোঃ আজিজুর রহমান, গোয়াইনঘাট (সিলেট) প্রতিনিধি | সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ১১...