সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে দিন শুরু করেন অনেকেই। দুধ-চিনি ছাড়া গরম কফি ঘুমঘুম ভাব দূর করে শরীর ও মনকে চাঙ্গা করতে পারে। কেউ কেউ আবার ওজন কমানোর আশায় খালি পেটে ব্ল্যাক কফি পান করেন।
তবে খালি পেটে ব্ল্যাক কফি পান করা কি সত্যিই উপকারী? এতে কি গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি বাড়ে? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া কঠিন। কারণ কফির প্রভাব ব্যক্তি, কফির পরিমাণ এবং আগে থেকে থাকা হজমের সমস্যার ওপর নির্ভর করতে পারে।
খালি পেটে কফি পান করলে কী হয়?
কফি ও ক্যাফেইন পরিপাকতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কফি পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বাড়াতে পারে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি অ্যাসিড রিফ্লাক্সের প্রবণতাও বাড়াতে পারে। ফলে খালি পেটে কফি পান করার পর কারও কারও বুকজ্বালা, টক ঢেঁকুর, পেটের অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব হতে পারে।
তবে কফি খেলেই সবার গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটি হবে—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কফি ও হজমের সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার ফলও একরকম নয়। তাই একজনের ক্ষেত্রে যে সমস্যা হচ্ছে, অন্যজনের ক্ষেত্রেও একই প্রতিক্রিয়া হবে—এমনটা বলা যায় না।
সাম্প্রতিক একটি পর্যালোচনায় ৪০টি গবেষণায় ১ লাখ ২২ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে কফি পানকারীদের মধ্যে গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ বা জিইআরডির হার সামান্য বেশি দেখা গেছে। তবে এই পার্থক্যের চিকিৎসাগত গুরুত্ব কতটা, তা স্পষ্ট নয়। ফলে সবার জন্য কফি বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণও নেই।
যাদের সতর্ক থাকা ভালো
যাদের অ্যাসিড রিফ্লাক্স, জিইআরডি বা সংবেদনশীল পাকস্থলী রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে খালি পেটে কফি অস্বস্তি বাড়াতে পারে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে ক্যাফেইন গ্রহণের পর অস্থিরতা, উদ্বেগ বা হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো অনুভূতিও হতে পারে।
তাই কফি পান করার পর নিয়মিত বুকজ্বালা, পেটের অস্বস্তি বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে খালি পেটে কফি পান না করে নাশতার পর পান করে দেখা যেতে পারে। প্রয়োজনে কফির পরিমাণ কমানো বা পানের সময় পরিবর্তন করেও দেখা যেতে পারে।
খালি পেটে ব্ল্যাক কফি কি ওজন কমায়?
ব্ল্যাক কফি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর একটি হলো, সকালে খালি পেটে এটি পান করলে শরীরের চর্বি দ্রুত কমতে শুরু করে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
ক্যাফেইন সাময়িকভাবে সতর্কতা বাড়াতে পারে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়ায় কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু খালি পেটে ব্ল্যাক কফি পান করলেই উল্লেখযোগ্যভাবে ওজন কমবে—এমন শক্ত প্রমাণ নেই।
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে মোট ক্যালরি গ্রহণ, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম ও জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্ল্যাক কফিকে ওজন কমানোর কোনো ‘ম্যাজিক ড্রিংক’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
দিনে কতটা কফি পান করা যায়?
কফির ক্ষেত্রে পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ করলে অস্থিরতা, হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, মাথাব্যথা, পেটের অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বলছে, অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দিনে মোট ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ক্যাফেইন সাধারণত নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত নয়। তবে ব্যক্তি ভেদে ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া কফির ধরন, পরিমাণ ও তৈরির পদ্ধতির ওপরও এক কাপ কফিতে ক্যাফেইনের পরিমাণ নির্ভর করে।
তাহলে কফি কীভাবে পান করবেন?
খালি পেটে কফি পান করার কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। যাঁদের খালি পেটে কফি পান করলে অস্বস্তি হয়, তাঁরা নাশতার পর কফি পান করতে পারেন। কফির পরিমাণও পরিমিত রাখা ভালো। ঘুমের সমস্যা থাকলে সন্ধ্যা বা রাতে ক্যাফেইন গ্রহণ কমানো যেতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, খালি পেটে ব্ল্যাক কফি সবার জন্য ক্ষতিকর—এমন প্রমাণ নেই। আবার সবার জন্য এটি উপকারী—এমন দাবিও করা যায় না। কফি পান করার পর শরীরে কোনো অস্বস্তি হচ্ছে কি না, সেটি খেয়াল করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: PubMed Central, U.S. Food and Drug Administration (FDA)
Leave a comment