রাজধানীর মুগদা থানা এলাকার মান্ডায় সৌদি প্রবাসী মোকাররম মিয়াকে খুন করে মরদেহ আট টুকরা করার লোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কাহিনী উন্মোচন করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। পরকীয়া সম্পর্ক, অর্থিক লেনদেন এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের জেরে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। ঘটনার আরও ভয়াবহ দিক হলো, মোকাররমকে বটি ও হাতুড়ি দিয়ে টুকরা টুকরা করার পরদিন অভিযুক্ত নারীরা রেস্তোরাঁয় গিয়ে বিরিয়ানি খেয়েছেন এবং রাতে নিজেদের বাসার ছাদে আনন্দ উল্লাসে ‘পার্টি’ করেছেন বলে জানিয়েছে এলিট ফোর্স র্যাব।
এর আগে গত রবিবার (১৭ মে) বিকেলে মুগদার মান্ডা এলাকার আবদুল গনি রোডের দুটি ভবনের মাঝখানের সরু গলি থেকে পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহের সাতটি অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পাশের একটি ময়লার স্তূপ থেকে নিহতের বিচ্ছিন্ন মাথাটি উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আঙুলের ছাপ ও প্রযুক্তির সহায়তায় নিশ্চিত করে যে, নিহত ব্যক্তির নাম মোকাররম মিয়া, যিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা এবং দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমে র্যাব মূল পরিকল্পনাকারী তাসলিমার বান্ধবী হেলেনা বেগম (৪০) এবং তার ১৩ বছর বয়সী কিশোরী মেয়েকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
সোমবার (১৮ মে) কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিহত মোকাররম মিয়ার সঙ্গে তার বন্ধু সুমনের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার ওরফে হাসনার দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কের সুবাদে মোকাররম তাসলিমাকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। গত বুধবার (১৩ মে) মোকাররম সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফিরে নিজের গ্রামের বাড়িতে না গিয়ে সরাসরি তাসলিমার সঙ্গে দেখা করতে ঢাকায় আসেন। পরে তাসলিমা তাকে কৌশলে মুগদায় তার বান্ধবী হেলেনার বাসায় নিয়ে যান। সেখানে মোকাররম তাসলিমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মোকাররম তার দেওয়া ৫ লাখ টাকা ফেরত চান এবং টাকা না দিলে তাদের মধ্যকার অন্তরঙ্গ ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের হাত থেকে বাঁচতে তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা মাফিক বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে মোকাররমকে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করার চেষ্টা করা হয়। পরে গভীর রাতে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা চালানো হলে মোকাররম জেগে ওঠেন এবং ধস্তাধস্তি শুরু করেন। এ সময় তাসলিমা পাশে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মোকাররমের মাথায় সজোরে আঘাত করেন এবং হেলেনা বটি দিয়ে উপর্যুপরি কোপাতে থাকেন। একপর্যায়ে হেলেনার ১৩ বছর বয়সী মেয়েও হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে মোকাররমের মৃত্যু নিশ্চিত করেন ।
হত্যাকাণ্ড আড়াল করতে তারা বটি দিয়ে মরদেহটি মাথা সহ মোট ৮টি খণ্ডে বিভক্ত করে পলিথিনে মুড়িয়ে মান্ডার বিভিন্ন নির্জন স্থানে ফেলে দেয়। র্যাব আরও জানায়, এই নৃশংসতা আড়াল করতে অপরাধীরা স্বাভাবিক আচরণ করার চেষ্টা করে এবং ঘটনার পরদিন হেলেনা, তার মেয়ে ও পলাতক তাসলিমা একটি অভিজাত হোটেলে গিয়ে বিরিয়ানি খান। এমনকি রাতে হেলেনার বাসার ছাদে তারা আনন্দ উৎসব বা পার্টিও করেন। বর্তমানে মূল অভিযুক্ত তাসলিমা আক্তার হাসনা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তাকে গ্রেফতারে র্যাবের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Leave a comment