আইনের কঠোরতা আর মানবিকতার লড়াইয়ে আবারও এক করুণ দৃশ্যের সাক্ষী হলো লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার। একটি সাধারণ জখমের মামলায় আড়াই বছরের শিশু সিয়ামকে কোলে নিয়ে মা ফারহানা আক্তার শিল্পি যখন প্রিজন ভ্যানে চড়ে জেলগেটে পৌঁছান, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিল তার স্কুলপড়ুয়া অপর দুই সন্তান। সোমবার (১১ মে, ২০২৬) বিকেলে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ফটকে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা ও আইনজীবীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সাহাপুর এলাকার মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়ার দায়ের করা একটি মারামারি মামলায় (সিআর ৫৬৫) আসামি ছিলেন প্রতিবেশী ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী ফারহানা আক্তার শিল্পি ও জহির উদ্দিন। সোমবার দুপুরে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত সদরের বিচারক শাহ জামাল আসামিদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বিকেলেই পুলিশি পাহারায় কোলের শিশুসহ শিল্পিকে জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল শিশুসহ ওই নারীর কারাবরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কারাগারে যাওয়া শিল্পির বড় সন্তান শিপন হোসেন (১০) পঞ্চম শ্রেণি এবং মেজো মেয়ে তামান্না আক্তার (৮) দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা স্থানীয় শহীদ স্মৃতি আদর্শ একাডেমিতে পড়াশোনা করে এবং বর্তমানে তাদের বার্ষিক পরীক্ষা চলছে। বিকেলে স্কুল শেষে তারা যখন খবর পায় মা কারাগারে, তখন তারা স্কুলড্রেস পরা অবস্থাতেই জেলা কারাগারের ফটকে ছুটে আসে। মায়ের প্রিজন ভ্যানটি গেটে আসতেই ‘মা মা’ বলে তাদের চিৎকারে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
এই মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন ও রাকিবুল হাসান তামিম অভিযোগ করেছেন, মামলার এজাহারে বাদী মাহাতাব উদ্দিন যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার সাথে প্রকৃত চিকিৎসাপত্রের কোনো মিল নেই। এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, শিল্পির রডের আঘাতে বাদীর ‘মাথার হাড় ভেঙে মগজ বের হয়ে গেছে’। অথচ লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের মেডিকেল সার্টিফিকেটে (এমসি) চিকিৎসকরা ওই আঘাতকে ‘সিম্পল’ বা সাধারণ জখম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আইনজীবী রাকিবুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সাধারণ জখমের মামলা সাধারণত জামিনযোগ্য হয়ে থাকে। অথচ আড়াই বছরের একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর কথা বিবেচনা না করে একজন নারীকে এভাবে কারাগারে পাঠানো অত্যন্ত দুঃখজনক ও অমানবিক।”
আসামি শিল্পির স্বামী ইসমাইল হোসেন সন্তানদের নিরাপত্তা ও পড়াশোনা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। ঘরে কোনো নারী অভিভাবক না থাকায় স্কুলপড়ুয়া দুই সন্তানের পরীক্ষা এবং তাদের দেখাশোনা করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মানবিকতা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ নেটিজেনরা।
Leave a comment