মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধ কাটিয়ে ইরান ও ইসরায়েল এখন এক সরাসরি ও বিধ্বংসী সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। শনিবার (২১ মার্চ) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা থেকে ইরান ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে কয়েক দফায় শত শত শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই নজিরবিহীন হামলায় ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ শহর ডিমোনা, আরাদ এবং হলোনসহ বিস্তীর্ণ এলাকা কেঁপে উঠেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে অন্তত ৬ জন নিহত এবং কয়েকশ মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে ইসরায়েলের ওপর হওয়া সবচেয়ে বড় সামরিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রণক্ষেত্রে পরিণত ডিমোনা ও আরাদ-ইসরায়েলের অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত ডিমোনা এবং দক্ষিণ প্রান্তের শহর আরাদ এবার ইরানি হামলার মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, শনিবার রাতে আকাশ চিরে আগুনের গোলার মতো ধেয়ে আসতে থাকে একের পর এক ব্যালিস্টিক মিসাইল। ইসরায়েলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘অ্যারো’ এবং ‘ডেভিডস স্লিং’ অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করলেও, বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় আঘাত হেনেছে।
ডিমোনা ও আরাদ শহরে কয়েক ডজন বহুতল ভবন ধসে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সড়কগুলোতে এখন কেবল অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আর ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করলেও স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধারণার চেয়েও অনেক বেশি।
হামলার পরপরই ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র ‘সোরোকা মেডিকেল সেন্টারে’ জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ইসরায়েলি আর্মি রেডিও জানিয়েছে, রাতভর অন্তত ১৫০ জন গুরুতর আহত ব্যক্তি সেখানে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। অন্যদিকে চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্য ইসরায়েলের হলোন শহরেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যেখানে অন্তত একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি হোম ফ্রন্ট কমান্ড নাগরিকদের বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সমগ্র দেশে মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে এবং প্রতি কয়েক মিনিট অন্তর অন্তর সাইরেন বেজে উঠছে, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন-ইরানের এই বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ঢেউ (Missile Wave) মোকাবিলায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একসাথে বিপুল সংখ্যক ‘হাইপারসনিক’ ও ‘ব্যালিস্টিক’ মিসাইল ব্যবহার করায় ডিফেন্স সিস্টেমগুলো ‘স্যাচুরেটেড’ বা অকার্যকর হয়ে পড়ছে। যদিও আইডিএফ দাবি করেছে যে তারা অধিকাংশ হুমকি সফলভাবে প্রতিহত করছে, কিন্তু ডিমোনা ও মধ্য ইসরায়েলের বিকট বিস্ফোরণগুলো সেই দাবির সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ইরান থেকে প্রথম দফা হামলার ঠিক এক ঘণ্টার মাথায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ক্ষেপণাস্ত্র ঢেউ শুরু হয়। একই সময়ে উত্তর ইসরায়েলে লেবানন থেকে রকেট হামলা চালানো হয়েছে বলে জানা গেছে, যা ইসরায়েলি বাহিনীকে দ্বিমুখী চাপের মুখে ফেলেছে।
ইরানের অবস্থান: ‘প্রতিশোধের চূড়ান্ত অধ্যায়’-তেহরান থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর করা পূর্ববর্তী আঘাতের ‘কঠোর প্রতিশোধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এই অভিযানকে সফল দাবি করে বলছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো নিখুঁতভাবে ইসরায়েলের সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষকে এই হামলার সমর্থনে মিছিল করতে দেখা গেছে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব-এই সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লেবানন সীমান্ত দিয়ে হিজবুল্লাহর সক্রিয়তা এবং মধ্য ইসরায়েলে ক্রমাগত সাইরেন বাজার ঘটনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও রণক্ষেত্রে তার কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলেও, ইরানের এই ব্যাপক সক্ষমতা প্রদর্শন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণকে আমূল বদলে দিয়েছে।
শনিবারের এই রক্তক্ষয়ী রাত ইসরায়েলের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এক বিশাল ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে। ডিমোনা থেকে শুরু করে মধ্য ইসরায়েল পর্যন্ত যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, তার রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য হবে অপরিসীম। ইসরায়েল এখন পাল্টা কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসা তো দূরের কথা, বরং আগামীর দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ সংঘাতের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা।
Leave a comment