যুক্তরাষ্ট্রে চলমান আংশিক সরকারি শাটডাউনের জেরে দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে বিশৃঙ্খলা ও দীর্ঘ লাইনের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অর্থায়ন বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (TSA)-এর কর্মীরা। বেতন না পাওয়ার কারণে অনেকেই চাকরি ছাড়ছেন বা কাজে অনুপস্থিত থাকছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিমানবন্দর কার্যক্রমে।
এই শাটডাউনের পেছনে রয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে রাজনৈতিক অচলাবস্থা। ডেমোক্র্যাটরা অভিবাসন কার্যক্রমে সংস্কারের দাবি জানালেও রিপাবলিকানরা তা প্রত্যাখ্যান করায় হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অর্থায়ন বিল পাস হয়নি। ফলে সংস্থাটির অধীন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
বিমানবন্দরগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে দৃশ্যমান। TSA-এর প্রায় ৫০ হাজার কর্মী প্রতিদিন যাত্রী ও লাগেজ তল্লাশি করেন। কিন্তু টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে পূর্ণ বেতন না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেক কর্মী অনিয়মিত ছুটি নিচ্ছেন, আবার কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। এতে করে জনবল সংকট তৈরি হচ্ছে, যা নিরাপত্তা কার্যক্রমকে ধীর করে দিচ্ছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ সময়ে যেখানে ২ শতাংশেরও কম কর্মী অনুপস্থিত থাকেন, সেখানে বর্তমানে কিছু বিমানবন্দরে অনুপস্থিতির হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। হিউস্টন, আটলান্টা ও নিউইয়র্কের মতো ব্যস্ত বিমানবন্দরে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। কোনো কোনো দিনে অনুপস্থিতির হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এই সংকটের ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কিছু বিমানবন্দরে নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে অপেক্ষার সময় ১০০ মিনিটের বেশি হচ্ছে। এতে ভ্রমণ পরিকল্পনায় বিঘ্ন ঘটছে এবং অনেক ফ্লাইট বিলম্বিত হচ্ছে।
শাটডাউনের কারণে ইতোমধ্যে শত শত TSA কর্মী চাকরি ছেড়েছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিমানবন্দর পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। তারা কংগ্রেসকে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে কর্মীদের বেতন নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিমান সংস্থার প্রধান নির্বাহীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমেরিকান এয়ারলাইনস, ডেল্টা, সাউথওয়েস্ট ও জেটব্লু’র কর্মকর্তারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, বেতন ছাড়া কর্মীদের পক্ষে দৈনন্দিন জীবনযাপন চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। তারা সতর্ক করেছেন, দ্রুত সমাধান না এলে বিমান ভ্রমণ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ যুক্তরাষ্ট্রে এখন বসন্তকালীন ছুটির মৌসুম চলছে, যখন ভ্রমণকারীর সংখ্যা বেড়ে যায়। পাশাপাশি সামনে রয়েছে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন, যা যাত্রী চাপ আরও বাড়াবে। এই অবস্থায় জনবল সংকট নিরাপত্তা ও সেবার মান উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই পরিস্থিতির জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তাদের কারণেই TSA কর্মীরা বেতন পাচ্ছেন না। তবে ডেমোক্র্যাটরা পাল্টা বলছেন, প্রশাসন অভিবাসন নীতিতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর ২০০২ সালে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ গঠন করা হয়। বর্তমানে এই বিভাগের অধীনে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী কাজ করছেন, যারা দেশের নিরাপত্তা, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সেবা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
সার্বিকভাবে, রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে সৃষ্ট এই শাটডাউন এখন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত সমাধান না এলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান পরিবহন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Leave a comment