ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিখোঁজের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দিল্লি পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিনেই রাজধানীতে মোট ৮০৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন। এই নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৫০৯ জনই নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে। সংখ্যাগুলো প্রকাশ্যে আসার পর রাজধানীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
স্থানীয় বার্তাসংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, জানুয়ারির প্রথম অর্ধে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৪ জন করে নিখোঁজ হয়েছেন। পুলিশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নিখোঁজদের মধ্যে ১৯১ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৬১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক। এখন পর্যন্ত ২৩৫ জনের সন্ধান মিললেও বাকি ৫৭২ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক নিখোঁজের হার রাজধানীর জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দিল্লি পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারির প্রথম ১৫ দিনে প্রতিদিন গড়ে ১৩ জন করে অপ্রাপ্তবয়স্ক নিখোঁজ হয়েছে। মোট ১৯১ জন নিখোঁজ অপ্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১৪৬ জনই মেয়ে, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এই পরিসংখ্যান শিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্ক নিখোঁজদের মধ্যেও নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ৬১৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ৩৬৩ জন নারী এবং ২৫২ জন পুরুষ। এদের মধ্যে ৯০ জন পুরুষ ও ৯১ জন নারীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে বাকিরা এখনও নিখোঁজ থাকায় পরিবারগুলোর মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত সামনে এসেছে। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, এত বিপুল সংখ্যক মানুষের নিখোঁজ হওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তাঁর ভাষায়, “এটা রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়। রাজধানীর মানুষের নিরাপত্তা যেন ঈশ্বরের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।” বিজেপির শাসনে এক বছর পার হওয়ার পর দিল্লি কেন এতটা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
অন্যদিকে, সমালোচনার জবাবে দিল্লি পুলিশ দাবি করেছে, পরিস্থিতি যতটা উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা ততটা নয়। বৃহস্পতিবার দিল্লি পুলিশ এক বিবৃতিতে জানায়, দিল্লিতে নিখোঁজের হার যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশের তুলনায় কম। পুলিশের মুখপাত্র বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শিশু বা কিশোর-কিশোরীরা কিছুটা দেরিতে বাড়ি ফিরলে কিংবা সাময়িকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেই উদ্বিগ্ন অভিভাবকেরা নিখোঁজ ডায়েরি করেন। এসব রিপোর্টও সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়ে যায়।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, সামগ্রিক পরিসংখ্যানের দিক থেকে দেখলে চলতি বছর নিখোঁজের সংখ্যা আগের দুই বছরের তুলনায় কম। দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মোট ১ হাজার ৭৭৭ জন নিখোঁজ হয়েছেন। তুলনামূলকভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪২ জন এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ছিল ১ হাজার ৭৮৬ জন। এছাড়া, ২০২৫ সালে সারা বছরজুড়ে মোট ২৪ হাজার ৫০৮ জন নিখোঁজ হওয়ার তথ্যও তুলে ধরেছে পুলিশ।
তবে মানবাধিকার কর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পরিসংখ্যানের তুলনার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, নিখোঁজদের বড় অংশ নারী ও কিশোরী হওয়ায় বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে দিল্লি পুলিশ তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন থানায় আলাদা টিম গঠন, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং আন্তঃরাজ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবুও, এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি।
সব মিলিয়ে, দিল্লিতে নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ইস্যু নয়, বরং নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, সামাজিক সচেতনতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
Leave a comment