গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআর কঙ্গো) পূর্বাঞ্চলীয় নর্থ কিভু প্রদেশের রুবায়া এলাকায় একটি কোলটান খনিতে ভয়াবহ ভূমিধসে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। গত বুধবার (২৮ জানুয়ারি) দুর্ঘটনাটি ঘটে। শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিদ্রোহীদের নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের মুখপাত্র লুমুম্বা কাম্বেরে মুইসা হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেন।
রুবায়া অঞ্চলটি বৈশ্বিক কোলটান উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের মোট কোলটানের প্রায় ১৫ শতাংশ এই এলাকা থেকে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কোলটান প্রক্রিয়াজাত করে ট্যান্টালাম ধাতু তৈরি করা হয়, যা উচ্চ তাপ সহনশীলতার জন্য প্রযুক্তি শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত—বিশেষ করে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, মহাকাশযানের উপাদান এবং গ্যাস টারবাইন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে এই খনির উৎপাদন আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
স্থানীয়দের বর্ণনায় জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় বহু শ্রমিক খনির ভেতরে হাতে খননকাজে নিয়োজিত ছিলেন। এ অঞ্চলে যন্ত্রপাতির বদলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপ্রাতিষ্ঠানিক ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে খনন পরিচালিত হয়। শ্রমিকরা দৈনিক কয়েক ডলারের বিনিময়ে কাজ করেন, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সীমিত বা অনুপস্থিত বলে অভিযোগ রয়েছে।
গভর্নরের মুখপাত্র মুইসা জানান, “এই ভূমিধসে ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে খনি শ্রমিক ছাড়াও নারী ও শিশুরাও রয়েছে।” তিনি বলেন, কিছু মানুষকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও তাদের বেশিরভাগই গুরুতর আহত। অন্তত ২০ জন আহত ব্যক্তি বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন আছেন। দুর্ঘটনার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, গভর্নরের এক উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মৃতের সংখ্যা অন্তত ২২৭ জন।
প্রশাসনিক সূত্রে বলা হয়েছে, নর্থ কিভু প্রদেশে বর্ষাকালে মাটি নরম ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, যা ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ায়। ভুক্তভোগীরা
গর্তের গভীরে কাজ করছিলেন, এমন সময় হঠাৎ উপরের মাটি ধসে পড়ে বলে জানা গেছে। দ্রুত উদ্ধারকাজ পরিচালনায় ভূপ্রকৃতি, নিরাপত্তাহীনতা এবং সরঞ্জামের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই খনিটি ২০২৪ সাল থেকে এএফসি/এম২৩ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। জাতিসংঘ পূর্বে অভিযোগ করেছে, এই গোষ্ঠী রুবায়ার খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে তাদের বিদ্রোহী কার্যক্রমে অর্থায়ন করছে, এবং এতে প্রতিবেশী রুয়ান্ডার সমর্থন রয়েছে বলে দাবি করেছে। তবে কিগালি সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সংঘাত, দারিদ্র্য এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খননব্যবস্থার কারণে ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে খনি দুর্ঘটনা নতুন নয়। তবু রুবায়ার সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় মানবিক সংকটকে আরও গভীর করেছে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার প্রচেষ্টা চালালেও প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সহায়তার ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কোলটানসহ বিভিন্ন ‘কনফ্লিক্ট মিনারেল’ বা সংঘাত-সম্পর্কিত খনিজের বৈশ্বিক চাহিদা থাকলেও উৎপাদনক্ষেত্রে শ্রমিক নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। রুবায়ার এই দুর্ঘটনা সেই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার আরেকটি করুণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এলো।
Leave a comment