ইন্দোনেশিয়ার প্রধান দ্বীপ জাভায় ভারী বৃষ্টিপাতের পর সৃষ্ট ভূমিধসে অন্তত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৮০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (বিএনপিবি) জানিয়েছে, পশ্চিম জাভা প্রদেশের পশ্চিম বান্দুং রিজেন্সির একটি গ্রামে শুক্রবার গভীর রাতে এই বিপর্যয় ঘটে। উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গত এলাকায় তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান জোরদার করেছে, তবে কাদামাটি ও ভাঙা স্থাপনার কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রাত প্রায় আড়াইটার দিকে টানা ভারী বর্ষণের পর পাহাড়ি ঢাল ধসে পড়ে। এতে একাধিক বাড়িঘর মাটির নিচে চাপা পড়ে এবং অনেকে ঘুমন্ত অবস্থায় আটকা পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে নিজেদের উদ্যোগে উদ্ধার চেষ্টা শুরু করেন; পরে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা যোগ দেন।
বিএনপিবির মুখপাত্র আব্দুল মুহারি শনিবার ভোরে এক বিবৃতিতে বলেন, “পশ্চিম জাভার পশ্চিম বান্দুং অঞ্চলে ভূমিধসের ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।” তিনি জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে আরও ধসের আশঙ্কা থাকায় উদ্ধারকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও অভিযান চালাতে হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলোতে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা আংশিক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোকে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, নিখোঁজদের সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে, কারণ প্রত্যন্ত এলাকা থেকে তথ্য আসতে সময় লাগছে।
ইন্দোনেশিয়ায় বর্ষাকাল সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই সময়ে পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেরা এলাকায় ভূমিধস এবং সমতলে বন্যা নিয়মিত ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হলে মাটি পানিতে স্যাচুরেটেড হয়ে ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে—ফলে বড় আকারের ধস নেমে আসতে পারে।
পরিবেশবিদদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বন উজাড় ও ভূমির ব্যবহার পরিবর্তনও ঝুঁকি বাড়ায়। গাছপালা কমে গেলে মাটির বন্ধন দুর্বল হয়, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচে নেমে আসে এবং কাদামাটির স্রোত জনবসতিতে ঢুকে পড়ে। এর সঙ্গে অনিয়মিত আবহাওয়া ও চরম বৃষ্টিপাতের প্রবণতা যুক্ত হয়ে দুর্যোগের তীব্রতা বাড়াচ্ছে।
গত বছরের শেষ দিকেও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ও মৌসুমি বর্ষণে ব্যাপক বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে বড় বন্যায় উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতি ঘটে বলে বিএনপিবির তথ্য উল্লেখ করে।
চলতি মাসের শুরুতেও ইন্দোনেশিয়ার সিয়াউ দ্বীপে প্রবল বর্ষণের পর আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ধারাবাহিক এসব বিপর্যয়ের পর কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সতর্কতা বাড়াতে বলছে। পাহাড়ি ঢালে নির্মাণ, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে টেকসই ভূমি-ব্যবস্থাপনা, বন সংরক্ষণ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থাই প্রাণহানি কমানোর প্রধান উপায়। জাভার সাম্প্রতিক এই ভূমিধস আবারও দেখিয়ে দিল, প্রাকৃতিক ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কতটা জরুরি।
Leave a comment