বাংলাদেশ ক্রিকেট অঙ্গনে নজিরবিহীন অস্থিরতার মধ্যে জাতীয় দলের অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) আর্থিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে ক্রিকেটারদের পরিশ্রম, পারফরম্যান্স ও জনপ্রিয়তার ওপর, সরকারের অনুদানে নয়।
বিসিবি পরিচালক ও অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান এম নাজমুল ইসলামের বিতর্কিত মন্তব্যের প্রতিবাদে চলমান ক্রিকেটার ধর্মঘটের মধ্যেই বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মিরাজ বলেন, ক্রিকেটারদের আয় ও বোর্ডের অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে জনমনে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা যখন খারাপ খেলি, তখন অনেকেই বলেন—আপনারা আমাদের টাকায় খেলছেন। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। আমরা যে আয় করি, তার বড় অংশ আসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এবং স্পনসরদের কাছ থেকে। বোর্ডের তহবিলও সেখান থেকেই গড়ে ওঠে।”
জাতীয় দলের অধিনায়ক আরও ব্যাখ্যা করেন, মাঠে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সই বিসিবির আর্থিক সক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি। “জাতীয় দল যদি না খেলত, যদি মাঠে ক্রিকেট না থাকত, তাহলে স্পনসর আসত না, আইসিসি থেকেও কোনো লভ্যাংশ আসত না। বোর্ড যে আজ এই অবস্থানে আছে, সেখানে খেলোয়াড়দের অবদান রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে তিনি কর প্রদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আমরা আমাদের আয়ের ওপর প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিই। অর্থাৎ সরকার আমাদের টাকা দেয় না, বরং আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিই,”—এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত আলোচনার জন্ম দেয়।
এই সংকটের সূচনা হয় এম নাজমুল ইসলামের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ঘিরে। এক অনুষ্ঠানে তিনি ক্রিকেটারদের উদ্দেশে বলেন, বোর্ড তাদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় কোনো সাফল্য বা পুরস্কার আসেনি। এমনকি তিনি ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেন, খেলোয়াড়রা খারাপ করলে তাদের পেছনে খরচ করা অর্থ ফেরত নেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। পাশাপাশি তামিম ইকবালকে ঘিরে ‘ভারতের দালাল’ জাতীয় মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
এই মন্তব্যের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা একযোগে এম নাজমুল ইসলামের পদত্যাগ দাবি করেন। কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা খেলতে চাই, কিন্তু সম্মান ছাড়া খেলা সম্ভব নয়। পুরো ক্রিকেট অঙ্গনকে অপমান করা হয়েছে। আমাদের দাবিগুলো মানা হলে আমরা অবশ্যই মাঠে ফিরব।”
বিসিবি ইতোমধ্যে এম নাজমুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে। তবে ক্রিকেটাররা জানিয়েছেন, শুধু নোটিশে তারা সন্তুষ্ট নন; পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
এই সংকট এখন শুধু একজন পরিচালকের বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে ক্রিকেটার ও বোর্ড প্রশাসনের মধ্যকার আস্থা ও সম্মানের প্রশ্নে। বিপিএল স্থগিত হওয়ায় বিসিবির ওপর যেমন চাপ বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সব পক্ষের চোখ এখন এম নাজমুল ইসলামের সিদ্ধান্তের দিকে। তিনি পদত্যাগ করবেন, নাকি বোর্ড অন্য কোনো সমাধান দেবে—সেই উত্তরই ঠিক করবে, বাংলাদেশের ক্রিকেট কত দ্রুত এই অচলাবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিক পথে ফিরতে পারে।
Leave a comment