Home আন্তর্জাতিক ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছেন মালালা
আন্তর্জাতিক

ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছেন মালালা

Share
Share

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মালালা ইউসুফজাই ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে নারীদের দীর্ঘদিনের দমন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত প্রতিবাদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বিশেষভাবে নারী ও কিশোরীদের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন, যা ইরানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

মালালা বলেন, ইরানের চলমান বিক্ষোভকে শুধু রাজনৈতিক অসন্তোষ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে শিক্ষা, চলাফেরা, পোশাক ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে নারীদের ওপর আরোপিত রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে একটি সমন্বিত প্রতিবাদ। তাঁর ভাষায়, “ইরানের মেয়েরাও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মেয়েদের মতো সম্মান, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চায়।”

মালালার মতে, কয়েক দশক ধরে ইরানে বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার দমন করা হয়েছে। নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বিধিনিষেধ মূলত একটি লিঙ্গভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অংশ, যা নজরদারি, বিচ্ছিন্নতা এবং শাস্তির মাধ্যমে কার্যকর করা হচ্ছে। এই বাস্তবতা থেকেই বর্তমান আন্দোলনের জন্ম, যেখানে নারীরা আর নীরব থাকতে রাজি নন।

তিনি বলেন, ইরানের নারীরা চায় তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হোক এবং তারা যেন নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। মালালার ভাষায়, বাইরের কোনো শক্তি কিংবা দমনমূলক শাসনের মাধ্যমে নয়, বরং ইরানের নারীদের নেতৃত্বেই সেই ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি শুধু নৈতিক সমর্থনই নয়, বরং আন্দোলনের মূল দর্শনকেও আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছেন—যে এই সংগ্রাম মূলত মর্যাদা, সমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের।

ইরানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে মালালার উদ্বেগ নতুন নয়। গত ডিসেম্বরে তিনি নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সঙ্গে একমত হয়ে খ্যাতনামা মানবাধিকারকর্মী নারগেস মোহাম্মাদির গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা জানান। মোহাম্মাদি দীর্ঘদিন ধরে ইরানে নারী অধিকার ও মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে কাজ করে আসছেন।

মালালার এই ধারাবাহিক অবস্থান দেখায় যে, তিনি ইরানের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছেন না, বরং এটি একটি বৃহত্তর মানবাধিকার সংকটের অংশ।

বর্তমান বিক্ষোভের সূচনা হয় গত ২৮ ডিসেম্বর, যখন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতন, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে তেহরানে মানুষ রাস্তায় নামে। দ্রুতই এই অসন্তোষ কারাজ, ইসফাহান, শিরাজ ও কেরমানশাহসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশেষ করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দিলে বিক্ষোভ আরও সংগঠিত ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক দাবির পাশাপাশি তখন থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্নও সামনে আসে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বহু স্থানে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, গণগ্রেপ্তার এবং টহল জোরদারের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে সরকার।

তবে এই কড়াকড়ি অনেক ক্ষেত্রে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

চলমান বিক্ষোভে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এক ইরানি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তিনি দাবি করেন, বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর উভয় পক্ষের মৃত্যুর জন্য ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী।

তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানায়, তাদের হিসাবে অন্তত ৬৪৬ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৫০৫ জন বিক্ষোভকারী ও নয়জন শিশু রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ৩১টি প্রদেশের ১৮৭টি শহরে ৬০০টির বেশি স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে এবং অন্তত ১০ হাজার ৭২১ জনকে আটক করা হয়েছে।
ইরান সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ হতাহতের হিসাব প্রকাশ করেনি।

মালালা ইউসুফজাইয়ের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বের সমর্থন ইরানের আন্দোলনে আন্তর্জাতিক মনোযোগ আরও বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বৈশ্বিক সংহতি বিক্ষোভকারীদের নৈতিক শক্তি জোগায় এবং একই সঙ্গে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

“হিজাব পরা নারীই একদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হবেন” — ওয়েইসি

ভারতের সমসাময়িক রাজনীতিতে আবারও নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (এআইএমআইএম) সভাপতি ও হায়দরাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়েইসি। “একদিন হিজাব পরা...

টাঙ্গাইলে পরিত্যক্ত খামারে মিলল অটোচালকের মাথার খুলি

টাঙ্গাইলে পরিত্যক্ত গরুর খামার থেকে অটোচালক রাশিদুলের মাথার খুলি, একটি পা এবং মেরুদণ্ডের হাড় উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে এ তথ্য...

Related Articles

বাংলাদেশি আলেমের হাতে অন্তিম মুহূর্তে ইসলাম গ্রহণ করলেন কোরিয়ান বৃদ্ধ

বাস্তব জীবনের কিছু গল্প কখনো কখনো কল্পনাকেও হার মানায়। দক্ষিণ কোরিয়ার আনসানের...

সীমান্তে গুলিবিদ্ধ শিশু হুজাইফার অবস্থা সংকটাপন্ন

মিয়ানমার সীমান্তে গুলিবিদ্ধ টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনানের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। উন্নত...

কুয়ালালামপুরে ইমিগ্রেশনের অভিযানে বাংলাদেশিসহ আটক ১৫০

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ইমিগ্রেশন বিভাগের পৃথক দুটি অভিযানে বাংলাদেশিসহ অন্তত ১৫০ জন...

থাইল্যান্ডে ট্রেন দুর্ঘটনা, নিহত ১৯

থাইল্যান্ডের উত্তর–পূর্বাঞ্চলে বুধবার সকালে এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ১৯ জন নিহত...