বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর দেশীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো দ্রুততার সঙ্গে এই খবর প্রকাশ করেছে। সিএনএন, বিবিসি, আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমসসহ শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রধান সংবাদে বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ইন্তেকালের খবর তুলে ধরে।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। এএফপি, আনাদোলু এজেন্সিসহ একাধিক বৈশ্বিক বার্তা সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে তথ্য পরিবেশন করে।
বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার পর ৮০ বছর বয়সে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত পটভূমি তুলে ধরা হয় এবং বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেতৃত্ব। বিবিসি তাঁর অসুস্থতা ঘিরে সাধারণ মানুষের আবেগ ও সহানুভূতির বিষয়টিও উল্লেখ করে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বিশেষভাবে স্থান পায় বিএনপির একজন সাধারণ কর্মী টিপু সুলতানের ঘটনা। চলতি মাসের শুরুতে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেখানে লেখা ছিল—‘আমি আমার কিডনি দিতে চাই বেগম খালেদা জিয়ার জন্য’। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এই দৃশ্যটি তুলে ধরা হয় জনসমর্থন ও আবেগের প্রতীক হিসেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, টিপু সুলতান হাসপাতালের বিপরীত পাশের ফুটপাথে দিন কাটাচ্ছিলেন এবং নেত্রীর সুস্থতার আশায় সেখানেই অবস্থান নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
সিএনএন তাদের প্রতিবেদনে খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করেন । প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দুই প্রধান রাজনৈতিক ধারার একটি নেতৃত্ব দিয়েছেন। সিএনএন তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ তুলে ধরে।
আল-জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, তাঁর নেতৃত্বে বিএনপির উত্থান এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করতেন। তাঁর মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস তাদের প্রতিবেদনে খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং তাঁর শাসনামলের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে প্রতিবেশী দেশ ভারতের গণমাধ্যমেও ব্যাপক সাড়া পড়ে। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই ও এএনআই দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করে। পাশাপাশি এনডিটিভি, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের অনলাইন ও সম্প্রচার মাধ্যমে খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করে। ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন অধ্যায় এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রতিবেদনে আরও জানায়, গত ২৩ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) নেওয়া হয় এবং সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর যেভাবে গুরুত্ব পেয়েছে, তা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাবের প্রতিফলন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।
Leave a comment