ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহিদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডে তদন্ত শেষে ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। মামলার তদন্তে উঠে এসেছে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী পালিয়ে যাওয়ার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের তথ্য। পাশাপাশি, আলোচিত এ হত্যার পেছনে দেশি-বিদেশি বৈঠক এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
ডিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়, মামলার তদন্তে গ্রেফতার আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য, ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা অস্ত্র ও গুলির ব্যালিস্টিক রিপোর্ট, এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব আলামতের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যালিস্টিক রিপোর্ট পজিটিভ পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
তদন্তে ডিবি দাবি করেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা ছিলেন মিরপুর এলাকার সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী ওরফে বাপ্পী। তার নির্দেশনায় সরাসরি গুলি চালান ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ। এ সময় তাকে সহযোগিতা করেন আদাবর থানা যুবলীগের কর্মী আলমগীর হোসেন শেখ।
হত্যাকাণ্ড সংঘটনের পর অভিযুক্তরা ভারতে পালিয়ে যান বলে তদন্তে জানা গেছে। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, পালিয়ে যাওয়ার পর ফয়সাল ও আলমগীরকে আশ্রয় দেন ফয়সালের ভগ্নিপতি মুক্তি মাহমুদ, যিনি হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র সংরক্ষণেও ভূমিকা রাখেন। এছাড়া সীমান্ত পারাপারে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে ফিলিপ স্নাল নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে।
ডিবি আরও জানায়, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে পালানোর সময় অভিযুক্তদের সহযোগিতা করেন নুরুজ্জামান উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও ও সঞ্জয় চিসিম। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হত্যাকারীরা নিরাপদে দেশত্যাগ করতে সক্ষম হন।
অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ধাপগুলোতেও পরিবারের সদস্যদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফয়সালের বাবা মো. হুমায়ুন কবির মোটরসাইকেলের নম্বরপ্লেট পরিবর্তন ও অস্ত্র স্থানান্তরে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। তার মা হাসি বেগম এবং বোন জেসমিন আক্তার অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়া ও অস্ত্র গোপন রাখতে সহায়তা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এদিকে, মামলার তদন্তের পাশাপাশি যমুনা টেলিভিশনের এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে নতুন ও চাঞ্চল্যকর দাবি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত পরিকল্পনা সিঙ্গাপুরে পাঁচ দিনব্যাপী একাধিক বৈঠকে করা হয়। ওই বৈঠকগুলোতে সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা এবং তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর উপস্থিতির অভিযোগ উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, দেশে ফিরে আসার পর ফয়সাল করিম মাসুদের সন্তানের নামে ৫৫ লাখ টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট (এফডি) খোলা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, এই অর্থ হত্যাকাণ্ডের পারিশ্রমিক বা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে মামলাটি এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করেছে। তবে আলোচিত রাজনৈতিক নামগুলোর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে এবং বিষয়টি জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার বিচার চলাকালে নতুন কোনো তথ্য বা আলামত পাওয়া গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
Leave a comment