সিলেটে এনসিপি নেতা নাহিদ, নাসির ও সারজিসের সফর বিতর্কের মধ্যেই শেষ হলো। বলা হচ্ছে— এ বিতর্ক অনাকাঙ্ক্ষিত। কেউ কেউ বলছেন, সাজানো নাটক। তবে মাজারের ভেতরে যে শোডাউন ও স্লোগান হয়েছে, তা দুটিই নজর কেড়েছে সিলেটবাসীর। এ নিয়ে চলছে আলোচনা ও সমালোচনা।
বিভাগীয় ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে বুধবার সিলেট আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। নগরের একটি কনভেনশন হলে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় ইফতার মাহফিল। এরপর এশা ও তারাবিহর নামাজ পড়তে তারা যান দরগাহ মসজিদে।
উপস্থিত লোকজন জানিয়েছেন— এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে তারা এশা ও তারাবিহর নামাজ আদায় করে মাজার জিয়ারত করেন। এ সময় তারা বেরিয়ে এসে দেখেন মাজারের সিঁড়ি ও উঠানে মানুষের ভিড়। অথচ নামাজের আগে এমন ভিড় ছিল না। যখন তারা মাজারে নামাজ পড়তে যান, তখন তেমন ভিড় ছিলই না। জিয়ারত শেষে নেতারা বেরিয়ে আসার পরই মাজার প্রাঙ্গণে স্লোগান শুরু করেন নেতাকর্মীরা। সেই স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো মাজার এলাকা।
তখন ভেতরে অনেক মুসল্লি নামাজে ছিলেন। আবার নামাজ শেষে অনেকেই জিয়ারতে ছিলেন। এনসিপি নেতাদের উপস্থিতিতে দেওয়া স্লোগানে মাজারে আসা ভক্ত ও মুসল্লিদের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্লোগানের একপর্যায়ে নেতাকর্মীরা নারী ইবাদতখানার ছাদের ওপর উঠে যান। তারা টেনে তোলেন সারজিস আলমকেও। এ সময় সারজিস নিজেও স্লোগান ধরেন। তার দেওয়া স্লোগানে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে আরও উৎসাহ দেখা যায়। প্রথমে দেওয়া হয় ‘জাস্টিস ফর হাদি’ স্লোগান। এরপর ‘দিল্লি না ঢাকা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে তারা মাজার থেকে বেরিয়ে যান।
সিলেটের ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারতে সব সময়ই আসেন রাজনৈতিক নেতারা। এ সময় মাজারে ভিড় হয়। তবে মাজারের পবিত্রতা রক্ষায় সবাই সাধারণত সতর্ক থাকেন। অন্তত মাজারের মূল ফটকের ভেতরে দলীয় বা রাজনৈতিক কোনো স্লোগান দেওয়া হয় না— এটাই দীর্ঘদিনের রেওয়াজ। সাধারণত স্লোগান দেওয়া হয় মূল ফটকের বাইরে।
কিন্তু এবার এনসিপির নেতাদের উপস্থিতিতে মাজারের উঠান থেকে সিঁড়ি পর্যন্ত স্লোগান দেওয়া হয়। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এমন ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সিলেটের অনেক মানুষ।
নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন— “সুলতানুল বাঙাল হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারতের সময় আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল দলীয় স্লোগান দিয়ে মাজার এলাকার আদব নষ্ট করেনি। আজ মধ্যরাতে মাজার জিয়ারতের নামে এনসিপির নেতৃবৃন্দ যে আচরণ করলেন, তা সুফি দরগার আদবের খেলাপ। মহিলা ইবাদতখানার ওপর উঠে সারজিস আলম স্লোগান দিলেন ‘দিল্লি না ঢাকা’। তাদের এই আচরণে আমি ক্ষুব্ধ।”
এই স্ট্যাটাসের পর অনেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন। একইভাবে প্রতিক্রিয়া জানান রাজনীতিক, কবি ও বাচিকশিল্পী সালেহ আহমদ খসরুও। তবে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর তাকে নিয়ে নানা মন্তব্য করা হয়, যা তাকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করেছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর তীব্র বিতর্ক শুরু হলে এনসিপির নেতারা মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেন। মাজার কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিলেও অধিক মানুষের উপস্থিতির কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিপির সিলেট মহানগরের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মো. আব্দুর রহমান আফজাল।
তিনি বলেন— “এমন পরিস্থিতির জন্য আমরাও প্রস্তুত ছিলাম না। নামাজ শেষে এনসিপি নেতারা মাজার জিয়ারত করে বেরিয়ে আসার সময় সিঁড়িতে নেতাকর্মীদের ভিড় দেখতে পান। একপর্যায়ে উপস্থিত নেতাকর্মীরা সারজিসকে জোর করে মহিলা ইবাদতখানার ওপর তুলে নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা দ্রুতই কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে গাড়িযোগে মাজার এলাকা ত্যাগ করি।”

Leave a comment