ঢাকার সাভারে নাকের পলিপাস ও টনসিলের অস্ত্রোপচার করাতে গিয়ে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে হাসপাতালটিতে ভাঙচুর চালিয়েছেন শিশুটির স্বজনেরা।
বুধবার দুপুরে সাভার পৌর এলাকার উলাইলে আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। শিশুটির স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসার কারণে তার মৃত্যু হয়েছে।
মারা যাওয়া শিশুটির নাম আব্রাহাম। সে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর এলাকার দুবাইপ্রবাসী আব্দুল আলীমের ছেলে। শিশুটির মা কনা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে মেরে ফেলেছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
কনা আক্তারের অভিযোগ, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই তাঁর ছেলের অস্ত্রোপচার করা হয়। এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলা ছিল।
কনা আক্তার জানান, ছেলের নাকে পলিপাস ও টনসিলের সমস্যার কারণে কয়েক দিন আগে আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিকিৎসক মো. সুমন হোসেনকে দেখান তিনি। তখন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন এবং এর আগে ইসিজি ও ইকো পরীক্ষা করাতে বলেন।
কনা আক্তার বলেন, মঙ্গলবার ওই হাসপাতালে ছেলের ইসিজি করানো হলেও চিকিৎসক না থাকায় ইকো পরীক্ষা করানো সম্ভব হয়নি। বাইরে থেকে পরীক্ষা করিয়ে আনার কথা জানালে চিকিৎসক তাঁকে বলেন, ইসিজি প্রতিবেদন ভালো এসেছে, তাই ইকো পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
শিশুটির মা জানান, চিকিৎসকের পরামর্শে বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালে যান তিনি। এরপর শিশুটিকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর অস্ত্রোপচারকক্ষের সামনে চিকিৎসক ও নার্সদের ছোটাছুটি করতে দেখেন তিনি। পরে তাঁকে জানানো হয়, ছেলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে এবং তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে হবে।
কনা আক্তার বলেন, হাসপাতালের লোকজনের পরামর্শে দুপুর দুইটার দিকে ছেলেকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান তিনি। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউর মেডিকেল অফিসার আব্দুল আহাদ বলেন, শিশুটিকে হাসপাতালে আনার সময় তার হৃদ্স্পন্দন ছিল না। পরীক্ষা করে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের জানানো হয়।
শিশুটির মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে চিকিৎসক আব্দুল আহাদ বলেন, আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে অজ্ঞান করার ওষুধ প্রয়োগের পর শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে তিনি শুনেছেন।
ঘটনার পর চিকিৎসক সুমন হোসেনসহ হাসপাতালটির অন্য চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য জানতে হাসপাতালে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। হাসপাতালটির মালিক মো. আব্বাস উদ্দিন ও চিকিৎসক সুমন হোসেনের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
হাসপাতালটিতে কয়েকজন রোগী ভর্তি থাকলেও চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় তাঁরা বিপাকে পড়েছেন।
সেখানে চিকিৎসাধীন সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘দুপুরে ভাঙচুরের পর থেকেই কোনো ডাক্তার-নার্সকে খুঁজে পাইনি। আমারও অপারেশন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কী করব বুঝতে পারছি না।’
হাসপাতালের সামনে দায়িত্ব পালনরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ঘটনার পর চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীরা চলে গেছেন। অনেক রোগীও চলে গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে দুই থেকে তিনজন রোগী রয়েছেন।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. ফজলে বারী বলেন, আব্বাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে অস্ত্রোপচারকক্ষে এক শিশুর মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন। তবে এ ঘটনায় তাঁদের কাছে কেউ অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফজর আলী বলেন, শিশুটির মরদেহের সুরতহাল করার সময় কোনো কাটাছেঁড়ার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। অজ্ঞান করার পর শিশুটির মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। এ ঘটনায় শিশুটির স্বজনেরা হাসপাতালটিতে ভাঙচুর করেছেন।
Leave a comment