সম্প্রতি রাশিয়ার আকাশে একসঙ্গে ‘দুটি সূর্য’ দেখা যাওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণ করা ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, সূর্যের পাশে আরেকটি উজ্জ্বল আলোর উৎস—যা দূর থেকে আলাদা একটি সূর্য বলে মনে হয়। মুহূর্তেই এই দৃশ্য অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই এটিকে রহস্যময় বা অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা দ্রুতই জানিয়ে দেন, এটি কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বিরল কিন্তু সুপরিচিত বায়ুমণ্ডলীয় আলোক-প্রভাব, যার নাম ‘সান ডগ’।
আবহাওয়াবিদ ও বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সান ডগ—যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে পারহেলিয়া (Parhelia) বলা হয়—এক ধরনের অপটিক্যাল ইফেক্ট। সাধারণত সূর্যের বাম, ডান বা উভয় পাশে উজ্জ্বল আলোর প্যাচ হিসেবে এটি দেখা যায়। আলোর এই প্যাচ এতটাই তীব্র হতে পারে যে, তা দূর থেকে দ্বিতীয় সূর্যের মতো মনে হয়। ইংরেজিতে একে কখনও ‘মক সান’ বলেও উল্লেখ করা হয়, যার অর্থ ‘নকল সূর্য’।
‘পারহেলিয়া’ শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক ভাষা থেকে—যেখানে para অর্থ ‘পাশে’ এবং helios অর্থ ‘সূর্য’। অর্থাৎ, সূর্যের পাশে অবস্থানকারী আলোক-বিভ্রম—যা নামটির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে বায়ুমণ্ডলের উঁচু স্তরে ভাসমান সূক্ষ্ম বরফের স্ফটিক।
শীতপ্রধান অঞ্চলে তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গেলে বায়ুমণ্ডলে ষড়ভুজাকৃতি (hexagonal) বরফের কণার সৃষ্টি হয়। এসব বরফের স্ফটিক প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্যের আলো এদের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করলে প্রতিসরণ (refraction) ও প্রতিফলনের (reflection) মাধ্যমে আলোর দিক পরিবর্তিত হয়। নির্দিষ্ট কোণে এই আলোক-বিচ্ছুরণ এমনভাবে ঘটে যে, পর্যবেক্ষকের চোখে সূর্যের পাশে আরেকটি উজ্জ্বল আলোর বিন্দু দেখা যায়। বাস্তবে আকাশে সূর্য থাকে একটিই—বাকি অংশটি কেবল আলোর বিভ্রম।
রাশিয়ার জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, সান ডগ আসলে বৃহত্তর হ্যালো (halo) পরিবারের অংশ। এই পরিবারের মধ্যে সূর্য বা চাঁদের চারপাশে বৃত্তাকার আলো দেখা যাওয়া, লুনার হ্যালো (চাঁদের প্রভা), এমনকি আলোকে ঘিরে রঙিন বলয় তৈরি হওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের সব ঘটনাই বরফের স্ফটিকের সঙ্গে আলোর মিথস্ক্রিয়ার ফল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সান ডগ সাধারণত সূর্য দিগন্তের কাছাকাছি থাকলে বেশি স্পষ্ট দেখা যায়—বিশেষ করে সকাল বা বিকেলে। তখন আলোর কোণ এমন থাকে যে বরফের কণাগুলো সর্বোচ্চ প্রতিফলন ও প্রতিসরণ ঘটাতে পারে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দৃশ্যটি আরও স্পষ্ট হয়, ফলে সাধারণ মানুষের নজরেও সহজে ধরা পড়ে।
যদিও এ দৃশ্য অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য বা অলৌকিক মনে হতে পারে, বিজ্ঞানীরা বলছেন এটি প্রকৃতির নিয়ম মেনেই ঘটে। শীতল আবহাওয়ার দেশ বা অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা মাঝে মাঝে দেখা যায়। উত্তর ইউরোপ, কানাডা, আলাস্কা কিংবা রাশিয়ার মতো ঠান্ডা এলাকায় সান ডগ তুলনামূলক বেশি নথিভুক্ত হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া রাশিয়ার সাম্প্রতিক ভিডিওটিও একই ধরনের প্রাকৃতিক আলোক-প্রভাবের উদাহরণ। ভিডিওতে সূর্যের দুই পাশে আলোর প্রতিফলন স্পষ্ট দেখা যায়, যা অনেকেই মোবাইল ফোনে ধারণ করে অনলাইনে ছড়িয়ে দেন। ঘটনাটি নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হলেও, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা সামনে আসার পর বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা মনে করিয়ে দেন, প্রকৃতির এমন দৃশ্য মানুষকে বিস্মিত করলেও এর পেছনে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। বরফের ক্ষুদ্র স্ফটিক, সূর্যের আলো এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থান—এই তিনটির সমন্বয়েই তৈরি হয় এমন চোখ ধাঁধানো দৃশ্য।
সবশেষে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য—আকাশে ‘দুটি সূর্য’ দেখা যাওয়া মানেই কোনো অস্বাভাবিক বা বিপজ্জনক ঘটনা নয়। বরং এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের জটিল ও সুন্দর আলোক-প্রক্রিয়ার একটি চমৎকার উদাহরণ, যা আমাদের প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যার গুরুত্ব আরও একবার মনে করিয়ে দেয়।
Leave a comment