ভারতের মধ্যপ্রদেশের ছিন্দওয়াড়া জেলায় একটি রহস্যময় মিষ্টির বাক্সকে ঘিরে টানা তিন দিনে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাগুলো খাদ্যে বিষক্রিয়া হিসেবে ধরা হলেও, পুলিশি তদন্তে সামনে এসেছে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ। তদন্তকারীরা বলছেন, মূল লক্ষ্য ছিলেন এক তরুণী; তবে সেই ষড়যন্ত্রের জেরে প্রাণ হারান আরও দুজন নিরীহ ব্যক্তি।
ঘটনার সূত্রপাত ৯ জানুয়ারি, ছিন্দওয়াড়ার জুননারদেও এলাকায়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের (পিএইচইডি) একটি অফিসের কাছাকাছি ঝুলন্ত অবস্থায় একটি ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। ব্যাগটির ভেতরে ছিল কিছু সবজি ও একটি মিষ্টির বাক্স। দীর্ঘ সময় সেটির মালিকানা দাবি না করায় এলাকাবাসীর কৌতূহল তৈরি হয়। পরবর্তীতে ওই পরিত্যক্ত মিষ্টিই হয়ে ওঠে একাধিক মৃত্যুর কারণ।
প্রথম ভুক্তভোগী ছিলেন ৫০ বছর বয়সি নিরাপত্তারক্ষী দাশরু যাদুবংশী। তিনি ওই মিষ্টি খাওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১১ জানুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শুরুতে ঘটনাটি স্বাভাবিক খাদ্যজনিত অসুস্থতা বলে মনে হওয়ায় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি।
পরবর্তী ঘটনায় পরিস্থিতি বদলে যায়। একই মিষ্টির বাক্সটি পরে নিকটবর্তী এক দোকানির পরিবারের কাছে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে ২২ বছর বয়সি খুশবু কথুরিয়া, তার ৭২ বছর বয়সি দাদা এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য ওই মিষ্টি খান। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসা দেওয়া হলেও খুশবু ও তার দাদার মৃত্যু হয়। পরিবারের আরও দুজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলেও প্রাণে বেঁচে যান।
একই উৎসের সঙ্গে যুক্ত একাধিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসায় পুলিশ নতুন করে তদন্ত শুরু করে। অনুসন্ধানে উঠে আসে পারিবারিক দ্বন্দ্বের একটি পটভূমি। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, খুশবু বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিলেন। তদন্তকারীদের ধারণা, এ ঘটনায় সামাজিকভাবে অপমানিত বোধ করেছিল তার শ্বশুরবাড়ির পক্ষ।
পুলিশের অভিযোগ, প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে খুশবুর শ্বশুর ঝাড়ু কাসার, দেবর শুভম ও ননদ শিবানী পরিকল্পিতভাবে মিষ্টির মধ্যে আর্সেনিক মিশিয়ে তা খুশবুর বাবার দোকানের আশপাশে ফেলে রাখেন। উদ্দেশ্য ছিল—খুশবু বা তার পরিবারের কেউ মিষ্টিটি খাবে। তবে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে প্রথমে ওই মিষ্টি খেয়ে ফেলেন নিরাপত্তারক্ষী দাশরু যাদুবংশী, যিনি ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না।
ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির (এফএসএল) পরীক্ষায় মিষ্টিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষাক্ত পদার্থটির মাত্রা ছিল অনুমোদিত সীমার তুলনায় বহু গুণ বেশি—যা একাধিক মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
তদন্তে প্রযুক্তিগত ও সাইবার তথ্য-প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সন্দেহভাজনদের গতিবিধি, যোগাযোগের তথ্য এবং ঘটনাস্থলের আশপাশের তথ্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়। অপরাধে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও কয়েকটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৩(১) ধারা অনুযায়ী হত্যা এবং ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, এই পরিকল্পনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না। এই ঘটনা খাদ্যে বিষ প্রয়োগের মতো গুরুতর অপরাধের ঝুঁকি ও সামাজিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক বিরোধ বা সামাজিক দ্বন্দ্ব যখন আইনগত ও সামাজিকভাবে সমাধান না হয়ে সহিংসতার দিকে মোড় নেয়, তখন নিরীহ মানুষও তার শিকার হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনও চলমান এবং ফরেনসিক ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জনসাধারণকে অচেনা বা সন্দেহজনক খাবার গ্রহণ না করার ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
Leave a comment