যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা পর্বতমালায় ভয়াবহ তুষারধসে ছয় ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ও তিন পেশাদার গাইডসহ মোট নয়জন নিহত হয়েছেন। গত ৪৫ বছরের মধ্যে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাণঘাতী তুষারধস হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা পুরো কমিউনিটিকে শোকাহত করে তুলেছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তুষারের বিশাল স্তর আচমকা ভেঙে পড়ে অভিযাত্রীদের ওপর আছড়ে পড়ে, ফলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
নিহতরা পেশাগত জীবনে সফল এবং পারিবারিক জীবনে দায়িত্বশীল মা ও স্ত্রী ছিলেন। পাহাড়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই তারা তিন দিনের একটি ব্যাককান্ট্রি স্কি অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত গাইড।
নিহতদের মধ্যে দুই বোন ছিলেন—লিজ ক্ল্যাবাঘ ও ক্যারোলিন সেকার। পরিবারের পক্ষ থেকে আরও চার বান্ধবীর পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে: ক্যারি অ্যাটকিন, ড্যানিয়েল কিটলি, কেট মোর্স এবং কেট ভিট। তারা আইডাহো ও ক্যালিফোর্নিয়ার বে এরিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন এবং বহু বছর ধরে একসঙ্গে স্কি অভিযানে অংশ নিতেন।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা সবাই দক্ষ স্কিয়ার ছিলেন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ নিয়েই অভিযানে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য শক্তির সামনে সেই প্রস্তুতিও টিকতে পারেনি।
ঘটনার সময় দলটি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ঠিক তখনই ফুটবল মাঠের সমান একটি বিশাল তুষারস্তর ধসে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বরফ ও তুষারের বিশাল স্তূপ তাদের ঢেকে ফেলে।
বিপদসংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকর্মীরা অভিযান শুরু করলেও প্রবল তুষারঝড়, ঝোড়ো হাওয়া ও শূন্য দৃশ্যমানতার কারণে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। কয়েক ঘণ্টা পর উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছালে দেখা যায়, নয়জনের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তবে ছয়জন অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন।
বেঁচে ফেরা সদস্যরা জানান, তুষারধসের পর তারা কয়েক ঘণ্টা একটি ত্রিপলের নিচে আশ্রয় নিয়ে উদ্ধারকারীদের অপেক্ষা করেন।
নেভাদা কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অস্থিতিশীল তুষারস্তর ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আটজনের মরদেহ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। কোনো ধরনের অবহেলা বা নিরাপত্তা ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিকভাবে এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
সিয়েরা নেভাদা দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাককান্ট্রি স্কিয়িং ও শীতকালীন অভিযানের জন্য জনপ্রিয়। প্রতি বছর হাজারো অভিযাত্রী এখানে আসেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও তুষারধসের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন ও তুষারস্তরের অস্থিতিশীলতা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী সারা বয়েলেনের মতে, যারা পাহাড়কে শান্তি ও মুক্তির জায়গা হিসেবে দেখেন, তাদের জন্য এ ধরনের দুর্ঘটনা গভীর মানসিক আঘাত বয়ে আনে। “যে স্থান মানসিক প্রশান্তি দেয়, সেই স্থানেই প্রিয়জনদের হারানো দীর্ঘমেয়াদি ট্রমার সৃষ্টি করতে পারে,” বলেন তিনি।
এই দুর্ঘটনায় আইডাহো ও ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতদের স্মরণে শোকবার্তা ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবার ও বন্ধুরা তাদের সাহসী, উদার ও প্রাণবন্ত মানুষ হিসেবে স্মরণ করছেন।
সিয়েরা নেভাদার মনোরম তুষারাবৃত পাহাড় কয়েক মুহূর্তে পরিণত হয়েছে এক মর্মান্তিক স্মৃতির স্থানে। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও ঝুঁকির মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই ট্র্যাজেডি আবারও মনে করিয়ে দিল—অভিযানের রোমাঞ্চ যতই আকর্ষণীয় হোক, পাহাড়ের শক্তি কখনোই হালকাভাবে নেওয়া যায় না।
সূত্র: CNN
Leave a comment