ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন যদি তাদের সামরিক সক্ষমতা পরীক্ষা করতে চায় বা যুদ্ধের পথে হাঁটে, তাহলে তেহরানও পূর্ণমাত্রায় জবাব দিতে প্রস্তুত। এমন স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, যিনি সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ইরানের বর্তমান সামরিক প্রস্তুতিকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী বলে বর্ণনা করেছেন।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) আলজাজিরা আরবিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার পথ এখনও খোলা আছে, তবে ইরান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমরা যুদ্ধ চাই না। কিন্তু যদি ওয়াশিংটন আমাদের সামরিক শক্তি পরীক্ষা করতে চায়—যা তারা আগেও করেছে—তাহলে আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।”
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনাকর সামরিক পরিস্থিতির সময় ইরানের যে প্রস্তুতি ছিল, বর্তমানে তা আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সামরিক মোতায়েন এবং কৌশলগত প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন আনা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় কিছু পক্ষ ওয়াশিংটনকে সংঘাতে টেনে নিতে চাইছে, যা গোটা অঞ্চলকে আরও বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আরাগচির মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
ইরানের ভেতরে চলমান গণআন্দোলন নিয়েও কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ঢুকে পড়েছে, যারা বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক কারণে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘট ডাকেন। সেই আন্দোলন থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্ষোভ ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট, পরিবহন, প্রশাসনিক কার্যক্রম—সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়ে, ফলে দেশের অনেক অংশ কার্যত অচল হয়ে যায়। ক্রমেই আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় সরকারের ওপর চাপও বাড়ছে।
সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ- লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই ইরানের বিক্ষোভের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে আসছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, ইরানের ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক সরকার যদি কঠোর ও সহিংস উপায়ে আন্দোলন দমন করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।
ট্রাম্পের এসব মন্তব্য তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইরান সরকার এ ধরনের বক্তব্যকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রোববার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে অর্থনীতি ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, তাঁর সরকার জনগণের কথা শোনার জন্য প্রস্তুত এবং দেশের আর্থিক সংকট কাটাতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করা কঠিন হবে। বাস্তব সংস্কার ও দ্রুত ফলাফল না এলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে।
একদিকে অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা—এই দুই চাপের মধ্যে পড়ে ইরান এখন এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। তেহরানের বার্তা পরিষ্কার: তারা সংঘাত চায় না, কিন্তু যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে শক্ত প্রতিরোধে প্রস্তুত।
মধ্যপ্রাচ্যের এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে যেকোনো ভুল হিসাব বড় আকারের সংঘাতে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র : আলজাজিরা
Leave a comment