পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বেড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বিরুদ্ধে ১০০ কোটি রুপির মানহানি মামলা দায়ের করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ও বিজেপি বিধায়ক শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর এক রাজনৈতিক বক্তব্যে নিজের নাম কয়লা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করেই এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) কলকাতার আলিপুর আদালতে এই মামলা দায়ের করা হয়। মামলার আবেদনে শুভেন্দু অধিকারী উল্লেখ করেন, মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য তার ব্যক্তিগত সম্মান, রাজনৈতিক ভাবমূর্তি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মামলায় দাবি করা ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১০০ কোটি রুপি।
৯ জানুয়ারি, কলকাতায় আয়োজিত এক রাজনৈতিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত হয়। ওই সভায় তিনি ‘কয়লার কালো টাকা’ বা কয়লা দুর্নীতির প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, শুভেন্দু অধিকারী এবং আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন না করায় বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক বিতর্ক শুরু হয়।
শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কাল্পনিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তার আইনজীবীর মাধ্যমে মমতা ব্যানার্জিকে একটি আইনি নোটিস পাঠানো হয়, যেখানে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অভিযোগের পক্ষে প্রামাণ্য নথি উপস্থাপনের আহ্বান জানানো হয়।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো লিখিত জবাব বা প্রমাণ না আসায় শুভেন্দু অধিকারী আদালতের শরণাপন্ন হন। আলিপুর আদালতে দায়ের করা মামলায় তিনি বলেন, কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ করা মানহানির শামিল।
মামলার আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যদি আদালত ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর করেন, তবে প্রাপ্ত অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার না করে জনকল্যাণমূলক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দান করা হবে।
মামলা দায়েরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামলার কপি শেয়ার করে শুভেন্দু অধিকারী লিখেছেন,“মমতা ব্যানার্জি আমার সম্পর্কে জঘন্য ও সম্পূর্ণ কাল্পনিক অভিযোগ করেছেন। তার নীরবতা আমাকে পাঠানো মানহানির নোটিসের জবাব হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমি আদালতে আপনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছি। দ্রুত একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করুন, নচেৎ আপনাকে ১০০ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।” তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিরোধী দলনেতার আইনজীবী আদালতে জানান, মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য মন্তব্যের ফলে শুভেন্দু অধিকারীর সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও বিরোধী দলনেতা হিসেবে তার ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছে, যা সরাসরি মানহানির আওতায় পড়ে। আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, মামলায় প্রমাণ করা হবে যে অভিযোগটি ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার কৌশল।
এই মামলাকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিজেপি নেতারা বলছেন, সত্য ও আইনের পথে থেকেই শুভেন্দু এই মামলা করেছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক সভায় দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের একাংশ নেতা মনে করছেন, এটি একটি রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল। তাদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার এবং তিনি কোনো বক্তব্য প্রমাণ ছাড়া দেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলা শুধু ব্যক্তিগত মানহানির প্রশ্ন নয়; বরং রাজ্যের শাসক দল ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে চলমান তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আইনি রূপ। আদালতে মামলার শুনানি শুরু হলে বিষয়টি আরও গভীরভাবে আলোচিত হবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানহানি মামলায় বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, প্রমাণের উপস্থিতি এবং বক্তব্যটি জনস্বার্থে ছিল কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
Leave a comment