ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) বার্ষিক অধিবেশনে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। এর মধ্য দিয়ে নতুন বছরের জন্য দেশটির আইনসভা কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। লন্ডনভিত্তিক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ডেলসি রদ্রিগেজ বলেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে যে কষ্ট ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে অবৈধ সামরিক আগ্রাসন ও বহিরাগত চাপের ফলে যে দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে, সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। তিনি জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করেন।
ডেলসি রদ্রিগেজের শপথগ্রহণ এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন ভেনেজুয়েলার রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থা তীব্র অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত করে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত আইনপ্রণেতাদের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও, বিরোধী পক্ষ একে বিতর্কিত বলে আখ্যা দিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি আদালতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে আনা মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। স্থানীয় সময় সোমবার রাত ৮টার দিকে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের আদালতে তাদের হাজির করা হয়। শুনানিকালে মাদুরো ও তার স্ত্রী উভয়েই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।
আদালতে দেওয়া বক্তব্যে নিকোলাস মাদুরো বলেন, “আমি নির্দোষ এবং একজন সৎ মানুষ। আমি এখনও আমার দেশের বৈধ প্রেসিডেন্ট।” তার এই বক্তব্য আদালতকক্ষ ও আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। মাদুরোর আইনজীবীরা দাবি করেন, এ মামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এটি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের শামিল।
এর আগে গত শুক্রবার রাতে ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার পর নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী
সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি কারাগারে রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ অনুযায়ী, তারা আন্তর্জাতিক মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটন ও কারাকাসের কূটনৈতিক উত্তেজনার অন্যতম কারণ।
শুধু মাদুরো দম্পতিই নন, একইসঙ্গে তাদের পুত্র গুয়েরা’র বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগ ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন পরিবারের বিরুদ্ধে আইনি চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেলসি রদ্রিগেজের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ এবং মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার প্রভাব ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর গভীর ছাপ ফেলতে পারে। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে বিন্যস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভেনেজুয়েলা আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার জনগণের দৃষ্টি এখন নতুন অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের দিকে—তারা কতটা স্থিতিশীলতা আনতে পারে এবং চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটিই আগামী দিনের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Leave a comment