জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসেরও কম সময়ে এমন কিছু রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন, যা তাঁর অনেক পূর্বসূরির পক্ষেই সম্ভব হয়নি। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দলের ভেতরের প্রবল বিরোধিতা উপেক্ষা করে তিনি সংসদের নিম্নকক্ষে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। অনেকে আশঙ্কা করেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবা-এর মতো তাকাইচিকেও ব্যর্থতার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে আগাম নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য পায় ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)।
নির্বাচনে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে সংবিধান সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়েছে। একই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছেন তাকাইচি। বিরোধী দলগুলোর প্রভাব কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ভিত্তিও আরও মজবুত করেছেন তিনি।
তবে অভ্যন্তরীণ সাফল্যের বিপরীতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জটিল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন জাপানের এই নেতা। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত বর্ধিত শুল্ক ইস্যু এখনো সমাধান হয়নি। এ বিষয়ে আলোচনা চলমান থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। আসন্ন ওয়াশিংটন সফরে এই বিষয়টি দুই দেশের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত হামলার পর বিশ্ব পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন নতুন করে চাপে ফেলেছে টোকিওকে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখতে সামরিক পদক্ষেপে মিত্র দেশগুলোর অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জাপানের নামও উল্লেখ করেন, যা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
এ বিষয়ে এখনো সরাসরি কোনো অবস্থান জানাননি তাকাইচি। সংসদে তিনি বলেছেন, আইনি সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জাপানের জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে। জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিক অনুরোধ না জানানোয় এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
বিদেশে সামরিক সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে জাপানের সাংবিধানিক বিধিনিষেধ বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি জনমতও এ ধরনের পদক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দেশটির শীর্ষ দৈনিক আসাহি শিম্বুন-এর এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের ইরান-সংক্রান্ত সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এমন পরিস্থিতিতে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের মতো আর্থিক সহায়তার পথ বেছে নিতে পারে জাপান। তবে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময়কার মতো সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততার সিদ্ধান্ত নেওয়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ, জনমতের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও এখন অনেক বেশি জটিল।
এদিকে, ‘অবাধ ও মুক্ত ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয়’ কৌশলকে সামনে রেখে নিজস্ব অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদারের প্রস্তাবও বিবেচনা করছে টোকিও। তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাব কীভাবে গ্রহণ করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালি ইস্যু জাপানের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প-তাকাইচি শীর্ষ বৈঠকে এই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই প্রেক্ষাপটে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর কৌশলগত দক্ষতা কতটা কার্যকর হয়, সেদিকেই এখন নজর বিশ্ববাসীর।
Leave a comment