২০২৬ আইসিসি টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং সরকারের মনোভাব বিবেচনায় নিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বোর্ড সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে যেমন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এই সিদ্ধান্ত বাড়তি মনোযোগ কেড়েছে।
রোববার দুপুরে বিসিবির ১৭ জন বোর্ড পরিচালকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চূড়ান্তভাবে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর আগে শনিবার রাতে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিসিবির পরিচালকেরা অনলাইনে একটি জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। সেই বৈঠকে বেশির ভাগ পরিচালক তখনই কঠোর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে পরবর্তীতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের মনোভাব ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মূল্যায়নের পর বোর্ডের অবস্থান বদলায়।
এ বিষয়ে দুপুরে বিসিবির ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমূল আবেদীন গণমাধ্যমকে বলেন, বোর্ড খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের অবস্থান জানাবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর বিকেল ৩টা ২২ মিনিটে ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজের ফেসবুক পোস্টে সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করেন। পোস্টে তিনি লেখেন, ২০২৬ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে বাংলাদেশ ভারতে যাবে না এবং ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নীতিগত অবস্থানের প্রেক্ষাপটে বিসিবির এই সিদ্ধান্তকে তিনি স্বাগত জানান।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। উগ্রপন্থীদের হুমকির প্রেক্ষিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর থেকেই প্রশ্ন ওঠে, বিশ্বকাপ চলাকালে বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা কতটা নিরাপদ থাকবেন। বিসিবির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই প্রেক্ষাপটেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০২৬ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক ভারত ও শ্রীলঙ্কা। প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি টুর্নামেন্টের প্রথম দিনেই ভারতের কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা ছিল বাংলাদেশের। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের বাকি তিনটি ম্যাচও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল কলকাতা ও মুম্বাইয়ে। অর্থাৎ পুরো গ্রুপ পর্বই ভারতের ভেন্যুতে নির্ধারিত ছিল, যা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বিশ্বকাপ সামনে রেখে আজ সকালেই বিসিবি লিটন দাসকে অধিনায়ক করে ১৫ সদস্যের দল ঘোষণা করেছে। দল ঘোষণার সময় আনুষ্ঠানিকভাবে ভেন্যু বা অংশগ্রহণ ইস্যুতে কিছু বলা না হলেও বোর্ডের অভ্যন্তরে যে আলোচনা চলছিল, তা স্পষ্ট ছিল। বোর্ড সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, খেলোয়াড়দের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ অর্থবহ থাকে না।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু ক্রীড়াঙ্গনের নয়, বরং কূটনৈতিক ও নীতিগত বার্তাও বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক খেলাধুলায় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব বাড়ছে। কোনো দেশ বা বোর্ড যদি মনে করে, তাদের খেলোয়াড়রা নিরপেক্ষ ও নিরাপদ পরিবেশ পাবে না, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা চাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে আইসিসির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যৌথ আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কাও থাকায় বিকল্প ভেন্যু ব্যবস্থাপনা আইসিসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে আইসিসি প্রয়োজনে সূচি ও ভেন্যু পুনর্বিন্যাস করেছে। বিসিবির চিঠির পর আইসিসি কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে ক্রিকেট বিশ্ব।
বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেটারদের কেউ কেউ মনে করছেন, সিদ্ধান্তটি সাহসী হলেও সময়োপযোগী। তাঁদের মতে, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় বোর্ডকে প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হয়। আবার কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের ওপর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির চাপ বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার বিসিবির সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকছে। এটি শুধু একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের প্রশ্ন নয়; বরং নিরাপত্তা, নীতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত একটি বড় সিদ্ধান্ত। আইসিসির পরবর্তী পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে, এই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের কাঠামো ও সূচিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনে।
Leave a comment