সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার বিছনাকান্দি সীমান্তের মুসলিমপাড়া এলাকায় এক যুবককে লাঠি দিয়ে মারধর করে আহত করার অভিযোগ উঠেছে বিজিবির দুই সদস্যের বিরুদ্ধে। তবে বিজিবি বলছে, ওই যুবককে মারধর করা হয়নি। চোরাচালানের মালামাল আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে তাঁরা তাঁকে ধাওয়া করেছিলেন। এ সময় পড়ে গিয়ে তিনি আহত হয়েছেন।
আহত যুবকের নাম আল আমিন (২৪)। তিনি উপজেলার বিছনাকান্দি ইউনিয়নের ঝাড়িখালকান্দি গ্রামের মৃত সফি উল্লাহর ছেলে। বর্তমানে তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাত সাড়ে সাতটার দিকে বিছনাকান্দি ইউনিয়নের বগাইয়া মুসলিমপাড়া গ্রামের রাজীবের দোকানের সামনে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আল আমিন রাজীবের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় বিছনাকান্দি বিজিবি ক্যাম্পের (বিওপি) দুই সদস্য রুজ্জেল ও হারুন আহমেদ সেখানে এসে তাঁকে লাঠি দিয়ে মারধর করেন। একপর্যায়ে লাঠির আঘাতে আল আমিন মাটিতে পড়ে যান বলে তাঁদের অভিযোগ।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ঘটনাস্থলটি সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬০০ মিটার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। সেখানে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবককে এভাবে মারধর করা ঠিক হয়নি। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে তাঁকে আটক করে আইনের আওতায় নেওয়া যেত।
স্থানীয় কয়েকজন আরও অভিযোগ করেন, বিজিবির সদস্য রুজ্জেল বিছনাকান্দি ক্যাম্পে আসার পর থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের দাবি, সম্প্রতি দুই শ্রমিককে মারধর করে আহত করা হয়েছে। এ ছাড়া সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে একটি বাড়ির সামনে থাকা মোটরসাইকেল ভাঙচুরের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
আল আমিনের ছোট ভাই রোহুল আমিন বলেন, মুসলিমপাড়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তাঁর ভাইকে বিজিবির সদস্যরা মারধর করে অচেতন করে ফেলেন। পরে স্থানীয় ও স্বজনেরা তাঁকে উদ্ধার করে গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন।
তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিছনাকান্দি বিওপির দায়িত্বে থাকা বিজিবির সদস্য হারুন আহমেদ। তিনি বলেন, বিছনাকান্দি পর্যটনকেন্দ্রের পাশে ভারতীয় জিরা বোঝাই একটি নৌকা তাঁরা আটক করেন। এ সময় চোরাকারবারিদের সঙ্গে তাঁদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। পরে দুই ব্যক্তি মোটরসাইকেলে করে ফেরার পথে তাঁদের গতিরোধ করে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন। এতে সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁদের ধাওয়া করা হলে ওই যুবক পড়ে গিয়ে হাঁটুতে আঘাত পান। এরপর তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।
বিছনাকান্দি বিওপির ক্যাম্প কমান্ডার নায়েব সুবেদার জালাল উদ্দীন বলেন, বিছনাকান্দি পর্যটনকেন্দ্র থেকে ২৫ থেকে ৩০ বস্তা ভারতীয় জিরা আটক করা হয়। এ সময় সেখানে থাকা শ্রমিকেরা হইচই শুরু করলে তাঁরা নৌকায় করে জব্দ করা জিরা ক্যাম্পে নিয়ে আসেন।
জালাল উদ্দীন আরও বলেন, বিজিবির দুই সদস্য মোটরসাইকেলে করে মুসলিমপাড়া মসজিদের দিকের রাস্তা দিয়ে ক্যাম্পে ফেরার সময় দোকানের সামনে চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা তাঁদের গতিরোধ করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে আল আমিনকে মারধর করা হয়নি।
তিনি বলেন, পরে শতাধিক বহিরাগত শ্রমিক আহত একজনকে নিয়ে ক্যাম্পের সামনে মিছিল করেন। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, চোরাচালানের মালামাল আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, ভারতীয় জিরা বোঝাই নৌকা আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি দল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল। বিজিবি সদস্যদের কারও গায়ে আঘাত না করার নির্দেশনা দেওয়া আছে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও বলা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক বলেন, ‘বিজিবি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। বাহিনীর সদস্য হয়ে কেন আমরা কাউকে মারধর করব? এ বিষয়ে আমার পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে।’
তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি সাজানো বলে তাঁরা মনে করছেন। বিজিবির সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় মামলা করা হবে বলেও জানান তিনি।
Leave a comment