দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়াকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখলেও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিনই সেই সিদ্ধান্ত আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিএনপির সাবেক নেত্রী ও আইনজীবী রুমিন ফারহানা। তবে এই ঘটনাকেই তিনি নিজের রাজনৈতিক জীবনের ‘নতুন অধ্যায়ের সূচনা’ হিসেবে দেখছেন।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় রুমিন ফারহানা বলেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বহিষ্কার অনিবার্য ছিল—এটা তিনি আগেই জানতেন। তবে শোকের দিনে দলীয় সিদ্ধান্ত ঘোষণাকে তিনি ব্যতিক্রমী বলেই মনে করছেন।
মঙ্গলবার ভোরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়। একই দিন সকাল ১১টায় বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠকে রুমিন ফারহানাসহ নয়জন নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে তাদের বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন,‘বহিষ্কার আদেশ আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু যেদিন তিনি (খালেদা জিয়া) চলে গেলেন, সেদিনই এই সিদ্ধান্ত—এটাকে আমি আল্লাহর একটা ইশারা হিসেবেই দেখি। যিনি আমাকে রাজনীতিতে এনেছিলেন, যার ছায়ায় আমি ছিলাম, তার বিদায়ের দিনেই বিএনপির সঙ্গে আমার যাত্রা শেষ হলো।’
তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর দিনে সাধারণত কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না—তা বাঙালি সংস্কৃতি হোক বা পশ্চিমা সংস্কৃতি। রাষ্ট্রীয় শোকের দিনে দলীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির বৈঠক ও বহিষ্কার আদেশকে সাধারণ মানুষ কীভাবে দেখবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
পেশায় আইনজীবী রুমিন ফারহানার রাজনীতিতে হাতেখড়ি ২০১২ সালে, বাবা অলি আহাদের মৃত্যুর পর। বাবা রাজনীতিবিদ হলেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের আন্দোলনের সময় বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে বিএনপির মুখপাত্রসুলভ ভূমিকায় গণমাধ্যমে নিয়মিত সরব ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে তার একটি বক্তব্য দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। বক্তব্যের শুরুতেই সংসদকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় বলে মন্তব্য করলে সরকারি দলের এমপিদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। নানা ইস্যুতে বক্তব্য এবং সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘটনায়ও আলোচনায় ছিলেন তিনি।
রুমিন ফারহানা জানান, খালেদা জিয়ার আহ্বান, অভিভাবকত্ব ও ছায়ায় তিনি টানা ১৭ বছর বিএনপির রাজনীতিতে ছিলেন। বয়স ও অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বড় দায়িত্ব পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
গত এক দশক ধরে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে দাবি করেন রুমিন ফারহানা। ২০১৮ সালে ওই আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন উকিল আব্দুস সাত্তার, যিনি পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তার পরবর্তী সময়ে দলীয় নির্দেশেই সেখানে নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছিল বলে জানান তিনি।
তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ওই আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা জুনায়েদ আল হাবিবকে প্রার্থী ঘোষণা করে। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন রুমিন ফারহানা।তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে জোটের প্রার্থী ঘোষণা আমার জন্য বিস্ময়কর ছিল। আমি দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় কাজ করেছি।’
উল্লেখ্য, বিএনপি যে নয়জনকে বহিষ্কার করেছে, তারা সবাই দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।দলীয় রাজনীতিতে তার অধ্যায় শেষ হলেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা নিয়ে আশাবাদী রুমিন ফারহানা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তিনি বলেন, মানুষের চাওয়ার ভিত্তিতেই স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শেষে তিনি বলেন,‘রাজনীতিতে এমপি বা মন্ত্রী হওয়া একেকটা ঘটনা। কিন্তু রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা অনেক বড় বিষয়। আমি একজন রাজনীতিবিদ হতে চাই।’
Leave a comment