জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে একাধিক নেতার পদত্যাগের ঘটনায় দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মতামতের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। সেই সিদ্ধান্তের পর কেউ দলে থাকবেন কি থাকবেন না—তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তিনি জানান, দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা এবং যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীনসহ কয়েকজন নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও আরও কিছু নেতার পদত্যাগের তথ্য দলের কাছে এসেছে বলে জানান তিনি।
পদত্যাগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “দল পরিচালনায় ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের চেয়ে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বরাবরই সেই নীতির ওপর আস্থা রেখেছি।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, যারা এনসিপির সঙ্গে যুক্ত আছেন বা ছিলেন, তারা এই বাস্তবতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলের অবস্থানও স্পষ্ট করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, শুরুতে এনসিপি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়েছে। তার দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পরাজিত শক্তিগুলো এখন নতুন করে সংগঠিত হয়ে জুলাই প্রজন্মকে দমন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নাহিদ ইসলাম জানান, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদী শক্তির প্রভাব থেকে রক্ষা করতে এনসিপি বাংলাদেশ
জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সঙ্গে থাকা আট দলের জোটের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তিনি বলেন, এই জোট কোনো একক দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নয়; বরং আধিপত্যবাদ, দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও বিচার—এই মৌলিক ইস্যুগুলোতে যৌথভাবে কাজ করার লক্ষ্যেই গঠিত হয়েছে।
নাহিদ ইসলামের ভাষায়, “আমরা মনে করি, বর্তমান বাস্তবতায় বৃহত্তর ঐক্য ছাড়া গণতান্ত্রিক ও সংস্কারমূলক রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই আদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কিছু মৌলিক প্রশ্নে ঐকমত্যের জায়গা তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।” তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই জোটে অংশ নিলেও এনসিপি তার নিজস্ব আদর্শ, লক্ষ্য ও রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, সোমবার একযোগে এনসিপির প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হবে। একই দিনে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। নির্বাচন ঘিরে দলের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা ও ঐতিহাসিক দায় নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, “এই জোট কেবল নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার উদ্দেশ্যে গঠিত—এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে এটাও সত্য, এটি একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি জোট। এনসিপি তার আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখেই এতে অংশ নিচ্ছে।” তিনি বলেন, অতীতের দায়-দায়িত্ব নিয়ে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন রয়েছে এবং সেটি বদলাচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেনও বক্তব্য দেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকার সমালোচনা করেন। আখতার হোসেন বলেন, “আওয়ামী লীগের শাসনামলে যে
পুলিশ বাহিনী নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করতে তৎপর ছিল, সেই বাহিনী এখন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।” তার মতে, এই অবস্থান নির্বাচনী পরিবেশ ও জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির ভেতরে সাম্প্রতিক পদত্যাগ এবং একই সঙ্গে নতুন জোটে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দলটির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও পরীক্ষা। একদিকে অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক সংহতি বজায় রাখা, অন্যদিকে জোট রাজনীতিতে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন তারা।
Leave a comment