এশিয়ার রাজনীতিতে ‘জেন-জি’ বা জেনারেশন-জেড গত কয়েক বছরে এক অপরাজেয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নেপাল ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই তরুণরা রাজপথে নেমে পুরনো ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। তবে সমীকরণ বদলে গেছে ভোটের মাঠে। নেপালে সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বে তরুণরা যখন সংসদের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে ২৪-এর অভ্যুত্থানের নায়কদের রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (এনসিপি) প্রথম নির্বাচনেই চরম ভরাডুবির শিকার হয়েছে।
নেপালের সাফল্যের নেপথ্যে: কৌশল ও ঐক্য
নেপালের রাজনীতিতে গত মাসে বালেন্দ্র শাহের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মাত্র চার বছর আগে গঠিত ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে পুঁজি করে বিপুল বিজয় অর্জন করে। আরএসপি নেতা কেপি খানাল মনে করেন, তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহিতার প্রশ্নে অনড় থাকা। নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো একক দল দীর্ঘকাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এবং বড় তিনটি দল জনসমর্থন হারানোয় তরুণদের জন্য পথটি সহজ হয়েছিল। বালেন্দ্র শাহ ও আরএসপির মধ্যকার কৌশলগত জোট এবং শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তাদের সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে দেয়।
বাংলাদেশে তারুণ্যের ‘হোঁচট’ খাওয়ার কারণ – বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ২০২৪-এর আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আশা করা হয়েছিল তরুণরাই আগামীর রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, দেড় বছরের দীর্ঘ ব্যবধানে আন্দোলনের গতি থিতিয়ে পড়ে। এর সুযোগ নেয় দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। বিশ্লেষক নীতাশা কৌল ও ইমরান আহমেদের মতে, বিরোধী দলগুলো নিজেদের ‘ভুক্তভোগী’ ও ‘সংস্কারপন্থি’ হিসেবে তুলে ধরে নিজেদের দিকে জনসমর্থন টানতে সক্ষম হয়।
সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখা হচ্ছে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থানকে। জেন-জি সমর্থকদের একাংশের অনিচ্ছা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীর মতো পশ্চাৎপদ শক্তির সঙ্গে জোট করায় এনসিপির প্রগতিশীল নারী ও তরুণ ভোটাররা দূরত্ব বজায় রাখে। এশিয়া সোসাইটির ঋষি গুপ্ত মনে করেন, এর ফলে তারা প্রজন্মের স্বার্থের চেয়ে ক্ষমতার প্রশ্নে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে, যা ভোটারদের মনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
হতাশা ও দেশত্যাগের প্রবণতা – নির্বাচনী ব্যর্থতার পর বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে এক ধরনের গভীর হতাশা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকর্মী উমামা ফাতেমা জানান, আগে যারা দেশে থাকার স্বপ্ন দেখত, সেই জেন-জি কর্মীরাও এখন জীবন বাঁচাতে বিদেশে কাজের সুযোগ খুঁজছেন। মেধা পাচারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেশের ভবিষ্যতের জন্য এক বড় অশনিসংকেত।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও শিক্ষা- নেপালের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু আবেগ বা ক্ষোভ দিয়ে নির্বাচন জেতা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সাংগঠনিক ভিত্তি। বাংলাদেশের তরুণরা যদিও ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ও সংবিধান পরিবর্তনের আলোচনা সামনে এনেছে, তবে মূলধারার রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে তাদের তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা এবং জোট গঠনের ক্ষেত্রে আরও দূরদর্শী হওয়ার বিকল্প নেই।
নেপালের তরুণরা এখন সংসদে থেকে পরিবর্তনের লড়াই চালাচ্ছে, আর বাংলাদেশের হতাশ জেন-জি প্রজন্ম আগামী দিনে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নতুন করে পথ খোঁজার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বার্তা বাজার
Leave a comment